১১:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

বিঙ্গো অঞ্চলের ডেনিম জয়যাত্রা: ঐতিহ্য, ‘ইন্ডিগো ব্লু’ আর নতুন প্রযুক্তিতে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো শিল্প

হিরোশিমা প্রিফেকচারের পূর্বাঞ্চলের বিঙ্গো এলাকা বহুদিনের টেক্সটাইল ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত হলেও এখন এটি বিশ্বের শীর্ষ ডেনিম উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটি। ফুকুয়ামা-ভিত্তিক কাইহারা প্রতিষ্ঠান ইউনিকলো, লিভাই’জ এবং এডউইন-এর মতো বিশ্বব্র্যান্ডকে ‘কাইহারা ডেনিম’ সরবরাহ করে জাপানের বাজারে ৪০ শতাংশ অংশ নিজের দখলে রেখেছে। সবকিছুর শুরু সেই গাঢ় নীল—‘ইন্ডিগো ব্লু’-এর প্রতি ভালোবাসা এবং বাঁচার লড়াই থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির গৌরবময় পথচলায়।


ইন্ডিগো নীল: যেখানে শুরু টেক্সটাইলের গল্প

‘ইন্ডিগো ব্লু’ ডেনিমের পরিচয়ের মূল। ১৮৯৩ সালে ইন্ডিগো-রঙের ‘কাসুরি’ কাপড় দিয়ে শুরু করা কাইহারা পরে বিভিন্ন উত্থান-পতনের পর ১৯৭০ সালে ডেনিম তৈরি শুরু করে।
১৯৬৯ সালে সদাহারু কাইহারা মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি উদ্ধার করতে রওনা হন। যাওয়ার আগে তিনি নিজের ওপর ৩০০ মিলিয়ন ইয়েনের ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ নেন—বুঝেছিলেন, প্লেন দুর্ঘটনা হলে অন্তত কোম্পানির ঘাটতি পূরণ হবে।

সে সময় জাপানে পশ্চিমা পোশাক জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কিমোনোতে ব্যবহৃত কাসুরির চাহিদা কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ‘সিক্স-ডে ওয়ার’ এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের অবমূল্যায়নে এক বছরের উৎপাদন জমে যায়।

টোকিওর ট্রেনস্টেশনগুলোতে সংবাদপত্র বিছিয়ে তিনি বসতেন, আর ডায়েরিতে লিখে রাখতেন কত তরুণ আমদানিকৃত ‘জিনস’ পরে চলছে। তখন ভিয়েতনামযুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে জাপানে জিনসের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল।

মধ্যপ্রাচ্য ফেরার পর তিনি স্থির করলেন—ডেনিমই হবে কাইহারার নতুন পথ।


প্রথম ডাইং মেশিন ‘নিনতাই-গো’: ধৈর্যের গল্প

ডেনিমে সময়ের সঙ্গে রঙ ফেড হওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ রঙাই পদ্ধতি। কাইহারা জানতেন, সুতার গুচ্ছের ভেতরের অংশ না রাঙালে ঘষায় ধীরে ধীরে সাদা দাগ উঠবে।
অর্থকষ্টের সময় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ জুড়ে তিনি তৈরি করেন প্রথম ডেনিম ডাইং মেশিন—‘নিনতাই-গো’ বা ‘ধৈর্য’।
১৯৭০ সালের শরতে তা চালু হলে শ্রমিকদের চোখে আনন্দের অশ্রু ভেসে ওঠে।

পরবর্তীতে স্পিনিং, ডাইং, উইভিং—সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলে কাইহারা। এখন তারা বছরে ১ কোটি ৭৩ লাখ জিনসের সমপরিমাণ ডেনিম তৈরি করে।

সদাহারু কাইহারা ২০১০ সালে ৮৪ বছর বয়সে মারা যান, তবে তিনি দেখে গেছেন তার প্রতিষ্ঠান বিশ্বের অন্যতম ডেনিম সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে।


সাকামোতো ডেনিম: বইয়ে নেই এমন প্রযুক্তি

সাকামোতো ডেনিমও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে উঠে আসে।
যুদ্ধকালে তাদের কারিগরদের বড় অংশ সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়, এমনকি ‘ডাই জারস’ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়।

১৯৬০-এর দশকে ইয়াসুশি সাকামোতো বিশ্বাস করতেন হাতের রঙাই দিয়ে আর প্রতিযোগিতা টিকবে না—তাই তিনি ‘মেশিন-ডাইং’ শুরু করার উদ্যোগ নেন।
প্রথম মেশিনে সুতা বারবার ছিঁড়ে যেত। তবুও তিনি রাতভর ভাবতেন, নতুনভাবে বানাতে হবে।

১৯৬৭ সালে কার্যকর মেশিন তৈরি হয়, যদিও স্থায়ী বিক্রি পেতে আরও কয়েক বছর লাগে।
আজ তাদের উন্নত রঙাই করা সুতা ‘লুই ভুঁইতোঁ’-এর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডকেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমান সভাপতি রিওইচি সাকামোতো পরিবেশবান্ধব ও খরচ-সাশ্রয়ী রঙাই পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেছেন।
তার মেয়ে মায়া সাকামোতো—বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট—কারখানার উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে নতুন সিস্টেম তৈরি করেছেন।


বিঙ্গো কাসুরির শেষ লড়াই: ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা

১৯৬০ সালে বিঙ্গো অঞ্চলে ২৭০টি কাসুরি উৎপাদক ছিল।
ফুচুর কিট্টাকা পরিবার ১৯৭৫ সালে ব্যবসায় যুক্ত হলে দেখেছিল, প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে কাসুরি তৈরি করে।

কিন্তু কাসুরি তৈরি সময়সাপেক্ষ—আগে নকশা করতে হয়, তারপর সুতা রাঙিয়ে বুনতে হয়। ধীরে ধীরে প্রিন্টেড কাপড় জনপ্রিয় হয়ে কাসুরির বাজার কমে যায়।

কিট্টাকা পরিবারের প্রধান কেইজো ২০০৩ সালে মৃত্যুর আগে ব্যবসা বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তবে তাদের ছেলে নোবুহিরো চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নেন—ঐতিহ্য বাঁচাতে হবে।
পুরনো লুমের যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় তিনি নিজেই সেগুলো মেরামত করে চালু রেখেছেন।

এখন অঞ্চলে মাত্র দুজন কাসুরি উৎপাদক বাকি। নোবুহিরো বলেন, “ইন্ডিগো রঙের নিজের একটা আত্মা আছে। যতদিন মানুষ চাইবে, আমরা এটাকে মরতে দেব না।”


ঐতিহ্য টিকে থাকে মনোবল, প্রযুক্তি আর সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানোর ক্ষমতায়

বিঙ্গো অঞ্চলের টেক্সটাইল শিল্প যুদ্ধ, বাজার ধস, আর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে লড়ে আজও বিশ্বজোড়া সুনাম ধরে রেখেছে। কাইহারা, সাকামোতো ও কিট্টাকা পরিবারের অটল নিষ্ঠায় নীল রঙের এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

#বিঙ্গো_ডেনিম #কাইহারা_ডেনিম #সাকামোতো_ডেনিম
#ইন্ডিগো_ব্লু #জাপান_টেক্সটাইল #ডেনিম_উৎপাদন
#ফুকুয়ামা #বিংগো_কাসুরি #জাপান_ফ্যাশন
#ডেনিম_ইতিহাস #জিনস_শিল্প #ফ্যাশন_সংস্কৃতি

জনপ্রিয় সংবাদ

বিঙ্গো অঞ্চলের ডেনিম জয়যাত্রা: ঐতিহ্য, ‘ইন্ডিগো ব্লু’ আর নতুন প্রযুক্তিতে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো শিল্প

১২:৩২:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

হিরোশিমা প্রিফেকচারের পূর্বাঞ্চলের বিঙ্গো এলাকা বহুদিনের টেক্সটাইল ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত হলেও এখন এটি বিশ্বের শীর্ষ ডেনিম উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটি। ফুকুয়ামা-ভিত্তিক কাইহারা প্রতিষ্ঠান ইউনিকলো, লিভাই’জ এবং এডউইন-এর মতো বিশ্বব্র্যান্ডকে ‘কাইহারা ডেনিম’ সরবরাহ করে জাপানের বাজারে ৪০ শতাংশ অংশ নিজের দখলে রেখেছে। সবকিছুর শুরু সেই গাঢ় নীল—‘ইন্ডিগো ব্লু’-এর প্রতি ভালোবাসা এবং বাঁচার লড়াই থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির গৌরবময় পথচলায়।


ইন্ডিগো নীল: যেখানে শুরু টেক্সটাইলের গল্প

‘ইন্ডিগো ব্লু’ ডেনিমের পরিচয়ের মূল। ১৮৯৩ সালে ইন্ডিগো-রঙের ‘কাসুরি’ কাপড় দিয়ে শুরু করা কাইহারা পরে বিভিন্ন উত্থান-পতনের পর ১৯৭০ সালে ডেনিম তৈরি শুরু করে।
১৯৬৯ সালে সদাহারু কাইহারা মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি উদ্ধার করতে রওনা হন। যাওয়ার আগে তিনি নিজের ওপর ৩০০ মিলিয়ন ইয়েনের ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ নেন—বুঝেছিলেন, প্লেন দুর্ঘটনা হলে অন্তত কোম্পানির ঘাটতি পূরণ হবে।

সে সময় জাপানে পশ্চিমা পোশাক জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় কিমোনোতে ব্যবহৃত কাসুরির চাহিদা কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি ছিল প্রতিষ্ঠানের প্রধান আয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালের ‘সিক্স-ডে ওয়ার’ এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের অবমূল্যায়নে এক বছরের উৎপাদন জমে যায়।

টোকিওর ট্রেনস্টেশনগুলোতে সংবাদপত্র বিছিয়ে তিনি বসতেন, আর ডায়েরিতে লিখে রাখতেন কত তরুণ আমদানিকৃত ‘জিনস’ পরে চলছে। তখন ভিয়েতনামযুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে জাপানে জিনসের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল।

মধ্যপ্রাচ্য ফেরার পর তিনি স্থির করলেন—ডেনিমই হবে কাইহারার নতুন পথ।


প্রথম ডাইং মেশিন ‘নিনতাই-গো’: ধৈর্যের গল্প

ডেনিমে সময়ের সঙ্গে রঙ ফেড হওয়ার জন্য প্রয়োজন বিশেষ রঙাই পদ্ধতি। কাইহারা জানতেন, সুতার গুচ্ছের ভেতরের অংশ না রাঙালে ঘষায় ধীরে ধীরে সাদা দাগ উঠবে।
অর্থকষ্টের সময় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ জুড়ে তিনি তৈরি করেন প্রথম ডেনিম ডাইং মেশিন—‘নিনতাই-গো’ বা ‘ধৈর্য’।
১৯৭০ সালের শরতে তা চালু হলে শ্রমিকদের চোখে আনন্দের অশ্রু ভেসে ওঠে।

পরবর্তীতে স্পিনিং, ডাইং, উইভিং—সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলে কাইহারা। এখন তারা বছরে ১ কোটি ৭৩ লাখ জিনসের সমপরিমাণ ডেনিম তৈরি করে।

সদাহারু কাইহারা ২০১০ সালে ৮৪ বছর বয়সে মারা যান, তবে তিনি দেখে গেছেন তার প্রতিষ্ঠান বিশ্বের অন্যতম ডেনিম সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে।


সাকামোতো ডেনিম: বইয়ে নেই এমন প্রযুক্তি

সাকামোতো ডেনিমও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে উঠে আসে।
যুদ্ধকালে তাদের কারিগরদের বড় অংশ সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়, এমনকি ‘ডাই জারস’ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়।

১৯৬০-এর দশকে ইয়াসুশি সাকামোতো বিশ্বাস করতেন হাতের রঙাই দিয়ে আর প্রতিযোগিতা টিকবে না—তাই তিনি ‘মেশিন-ডাইং’ শুরু করার উদ্যোগ নেন।
প্রথম মেশিনে সুতা বারবার ছিঁড়ে যেত। তবুও তিনি রাতভর ভাবতেন, নতুনভাবে বানাতে হবে।

১৯৬৭ সালে কার্যকর মেশিন তৈরি হয়, যদিও স্থায়ী বিক্রি পেতে আরও কয়েক বছর লাগে।
আজ তাদের উন্নত রঙাই করা সুতা ‘লুই ভুঁইতোঁ’-এর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডকেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

বর্তমান সভাপতি রিওইচি সাকামোতো পরিবেশবান্ধব ও খরচ-সাশ্রয়ী রঙাই পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেছেন।
তার মেয়ে মায়া সাকামোতো—বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট—কারখানার উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে নতুন সিস্টেম তৈরি করেছেন।


বিঙ্গো কাসুরির শেষ লড়াই: ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা

১৯৬০ সালে বিঙ্গো অঞ্চলে ২৭০টি কাসুরি উৎপাদক ছিল।
ফুচুর কিট্টাকা পরিবার ১৯৭৫ সালে ব্যবসায় যুক্ত হলে দেখেছিল, প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে কাসুরি তৈরি করে।

কিন্তু কাসুরি তৈরি সময়সাপেক্ষ—আগে নকশা করতে হয়, তারপর সুতা রাঙিয়ে বুনতে হয়। ধীরে ধীরে প্রিন্টেড কাপড় জনপ্রিয় হয়ে কাসুরির বাজার কমে যায়।

কিট্টাকা পরিবারের প্রধান কেইজো ২০০৩ সালে মৃত্যুর আগে ব্যবসা বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তবে তাদের ছেলে নোবুহিরো চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নেন—ঐতিহ্য বাঁচাতে হবে।
পুরনো লুমের যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় তিনি নিজেই সেগুলো মেরামত করে চালু রেখেছেন।

এখন অঞ্চলে মাত্র দুজন কাসুরি উৎপাদক বাকি। নোবুহিরো বলেন, “ইন্ডিগো রঙের নিজের একটা আত্মা আছে। যতদিন মানুষ চাইবে, আমরা এটাকে মরতে দেব না।”


ঐতিহ্য টিকে থাকে মনোবল, প্রযুক্তি আর সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানোর ক্ষমতায়

বিঙ্গো অঞ্চলের টেক্সটাইল শিল্প যুদ্ধ, বাজার ধস, আর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে লড়ে আজও বিশ্বজোড়া সুনাম ধরে রেখেছে। কাইহারা, সাকামোতো ও কিট্টাকা পরিবারের অটল নিষ্ঠায় নীল রঙের এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

#বিঙ্গো_ডেনিম #কাইহারা_ডেনিম #সাকামোতো_ডেনিম
#ইন্ডিগো_ব্লু #জাপান_টেক্সটাইল #ডেনিম_উৎপাদন
#ফুকুয়ামা #বিংগো_কাসুরি #জাপান_ফ্যাশন
#ডেনিম_ইতিহাস #জিনস_শিল্প #ফ্যাশন_সংস্কৃতি