ইসরায়েলের কারাগারে দুই দশক ধরে বন্দী মারওয়ান বারগুতির একটি সাম্প্রতিক ভিডিও আবারও সামনে এনেছে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব সংকটের গভীরতা। ক্ষীণদেহ, অবসন্ন চোখ আর এক মন্ত্রীর তিরস্কার—এই দৃশ্যটিই এখন বারগুতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রতীকী অবস্থানের নতুন চিত্র। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে আটক থেকেও তিনি এখনো ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।
সম্ভাব্য নেতৃত্বের প্রশ্নে বারগুতির গুরুত্ব
১৪ বছর পর প্রকাশিত ভিডিওটি আগস্টে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরের সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। বারগুতির পরিবার জানায়, তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর ছেলে আরব বলেন—“বন্দিদের মনোবল ভাঙতে চাইলে আগে তাঁর মনোবল ভাঙার চেষ্টা করা হয়।”
অক্টোবরের মাঝামাঝি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে গাজা যুদ্ধ শেষ করতে সম্ভাব্য বন্দি বিনিময় চুক্তিতে বারগুতির মুক্তি আলোচনায় এসেছে। তবে ইসরায়েলি সরকার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। বিশ্লেষকদের মতে, বারগুতি মুক্তি পেলে তিনি ফিলিস্তিনি সমাজে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন—যা বর্তমান নেতানিয়াহু সরকারের কাছে রাজনৈতিক ঝুঁকি।
হামাসের ৭ অক্টোবর ২০২৩ হামলার দুই বছর পরও গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা অনিশ্চিত। ৯০ বছর বয়সী মাহমুদ আব্বাসের উত্তরসূরি নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়—বারগুতি একাই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানের প্রার্থীদের সম্মিলিত সমর্থনের সমান জনপ্রিয়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বারগুতিকে “হুমকি” আখ্যা দিয়ে বলেন, “তাকে নেতা বলা মানে আসাদকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বলা।” তবে নিরাপত্তাখাতের কিছু প্রবীণ কর্মকর্তা ভিন্নমতের—তাদের মতে, দুই রাষ্ট্র সমাধানে বিশ্বাসী এমন নেতার সঙ্গে আলোচনার পথ খুলে যেতে পারে।

ছাত্রনেতা থেকে কারাবন্দী জনপ্রিয় মুখ
পশ্চিম তীরের কোবার গ্রামে জন্ম নেওয়া বারগুতি প্রথম ইন্তিফাদায় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েল তাকে আল-আকসা মার্টার্স ব্রিগেডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। ২০০২ সালে হত্যা মামলায় পাঁচটি যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়—যে অভিযোগ তিনি সবসময় অস্বীকার করেছেন।
২০০৬ সালে কারাগারে থেকেই তিনি ‘প্যালেস্টাইন প্রিজনার্স ডকুমেন্ট’ তৈরিতে নেতৃত্ব দেন, যা ফাতাহ-হামাসসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে ভূমিকা রাখে। ২০১4 সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেন—ফিলিস্তিনি ঐক্য ছাড়া জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের পথ নেই।
কারাগারে বারগুতি নিয়মিত পাঠদান ও আত্মশিক্ষায় সময় কাটান। মাসে সাত-আটটি বই পড়ে তিনি অন্যান্য বন্দিদেরও পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন।
মুক্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত
৭ অক্টোবর হামলার পর তার ওপর নির্যাতন আরও বেড়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। সদ্য মুক্ত কয়েকজন ফিলিস্তিনি বন্দির বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রচারকরা বলেন—কারারক্ষীদের হামলায় তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন এবং রক্তমাখা অবস্থায় সেলে ফিরিয়ে আনা হয়।
ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বারগুতির অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ওয়াশিংটনও গত বছর বলেছিল—ফিলিস্তিনি বন্দিদের আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে রাখতেই হবে।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, বারগুতির মুক্তি বিবেচনায় আনতে হলে ইসরায়েলে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন হতে পারে—যে নেতৃত্ব ফিলিস্তিনে ঐক্যকে হুমকি নয়, বরং আলোচনার সম্ভাবনা হিসেবে দেখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















