ইসরায়েলের পশ্চিম তীরের শিলোহ এলাকায় জড়ো হওয়া প্রায় এক হাজার ইভানজেলিকাল খ্রিস্টান যাজক ও প্রভাবশালীরা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন—জুডিয়া ও সামারিয়া নিয়ে ইসরায়েলের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করলে তা ইভানজেলিকাল সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হবে।
শিলোহে সমাবেশ ও রাজনৈতিক বার্তা
শুক্রবার প্রায় মধ্যাহ্নে পশ্চিম তীরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান শিলোহে খোলা মঞ্চের অনেক আসন তখনো খালি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক ইভান্স, যিনি জেরুজালেমের ‘ফ্রেন্ডস অব জায়ন মিউজিয়াম’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর ইভানজেলিকাল উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ছিলেন, যাজকদের আসনে বসতে আহ্বান জানান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী একটি ভিড়ভাট্টা সমাবেশের ছবি চান, আর সেটিই তাদের দায়িত্ব।
এই সপ্তাহব্যাপী সব খরচ বহন করা সফরের অর্থ জোগাচ্ছে ইসরায়েল সরকার—এ কথা উপস্থিত কারও অজানা নয়। ইভান্সের ইঙ্গিত স্পষ্ট, এর বিনিময়ে নেতানিয়াহুকে একটি শক্তিশালী দৃশ্যমান সমর্থনের ছবি দেওয়া অন্তত তাদের কর্তব্য।
ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে সরাসরি উদ্দেশ্য
ইভান্স তাঁর বক্তব্যে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ করে কথা বলেন। বিশেষ করে ভ্যান্সের দিকে তাঁর কটাক্ষ ছিল তীব্র, কারণ অক্টোবরে ইসরায়েল সফরে ভ্যান্স জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দ্বারা সংযুক্ত করার বিরোধী।
বাইবেল হাতে তুলে ধরে ইভান্স বলেন, এই বই এবং এই ঈশ্বরের ওপর ভিত্তি করেই ‘মাগা’ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতার শিকড় এই ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রোথিত। তাঁর ভাষায়, জুডিয়া ও সামারিয়া বাইবেলের ভূমি, এবং ইসরায়েলকে তা ছাড়তে চাপ দেওয়া ঈশ্বরের নীতির বিরোধী।
যাজকদের ঐক্য প্রদর্শন
ইভান্স যাজকদের আহ্বান জানান, যদি তারা তাঁর সঙ্গে একমত হন, তবে উঠে দাঁড়িয়ে তা দেখাতে। তিনি চান প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট যেন এই সমর্থনের দৃশ্য দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই কোনো যাজক বসে থাকেননি—সমাবেশ দাঁড়িয়ে ঐক্যের বার্তা দেয়।
সবচেয়ে বড় ইভানজেলিকাল প্রতিনিধি দল
এই ‘অ্যাম্বাসাডরস সামিট’কে ইসরায়েল সফরকারী খ্রিস্টান নেতাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি দল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বুধবার সফরের শুরু হয় ৭ অক্টোবরের হামলায় নিহতদের স্মরণে নোভা ফেস্টিভ্যাল স্থল পরিদর্শনের মাধ্যমে। পরবর্তী দিনগুলোতে সাবেক জিম্মি, সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক এবং জেরুজালেমের মাউন্ট হার্জেল সামরিক কবরস্থান সফরের সূচি রয়েছে।
শিলোহে ধর্ম ও রাজনীতির মেলবন্ধন
শিলোহের প্রত্নস্থলে প্রাচীন ইসরায়েলিদের উপাসনালয় তাবারনাকল ও সিন্দুকের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। এখানেই ইহুদি বসতি আন্দোলন ও খ্রিস্টান ডানপন্থীদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয় বসতির নারীরা গাইড হিসেবে বাইবেলের ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও ব্যাখ্যা করেন।
বসতি আন্দোলনের দাবি ও চাপ
মঞ্চে শোফার বাজানোর পর ইভান্স যাজকদের একত্রে প্রার্থনায় আহ্বান জানান। তাঁকে ‘জুডিয়া ও সামারিয়ার সম্মানসূচক নাগরিক’ ঘোষণা করা হয়। বসতি আন্দোলনের নেতা ইসরায়েল গান্টজ যাজকদের ‘জুডিয়া ও সামারিয়ার রাষ্ট্রদূত’ আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটনে নিজেদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের পক্ষে কথা বলার অনুরোধ জানান। তাঁর দাবি, এখানে ইসরায়েলি আইন প্রয়োগই ঈশ্বরের ন্যায়বিচার।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের ইতিহাস
মাইক ইভান্স এর আগেও ইভানজেলিকাল সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি ও মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের দাবিতে তিনি ব্যাপক প্রচারণা চালান। পরে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় ২০২১ সালে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের অভিযোগে সমালোচিত হন।
সে সময় অনেক খ্রিস্টান নেতা তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেলেও, এবারের বিশাল মিশন দেখাচ্ছে যে তিনি আবারও ইভানজেলিকাল মহলে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছেন। এই সমাবেশের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় সমর্থনের শক্তি নতুন করে সামনে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















