০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
নিজের হাতে শেখা থেকে জেনেভার মঞ্চে: চীনা ঘড়িনির্মাতা কিয়ান গুওবিয়াওর নতুন যাত্রা ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপের বদলে যাওয়া মনোভাব, ভেঙে পড়ছে পুরোনো নির্ভরতা ইরান যুদ্ধ: সাম্রাজ্য পতনের ইঙ্গিত নয়, বরং পুরোনো নীতির পুনরাবৃত্তি চীনে যাচ্ছে ডিসিসিআই প্রতিনিধিদল, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জোরদারে নতুন উদ্যোগ গোয়েন্দা কনানের বিস্ময়কর সাফল্য: ছোট্ট গোয়েন্দা থেকে বিশ্বজোড়া বক্স অফিস জাদু বই ‘রেভোলুসি’ ফিরে এল নিজভূমিতে: তরুণ প্রজন্ম, স্মৃতি ও বান্দুংয়ের চেতনা নিয়ে ডেভিড ভ্যান রেইব্রুক মার্কিন অবরোধ, উত্তেজনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা: ইরানকে ঘিরে নতুন সংঘাতের বিস্তার সীমা পুনর্নির্ধারণ, জাতিগত গণনা ও সংরক্ষণ বিল ঘিরে বিরোধীদের আপত্তি; ১৫ এপ্রিলের বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোট দিয়েছি, তবু ‘সন্দেহভাজন’ ভোটার কেন? ২৫০ আসনে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস

দিল্লির ধোঁয়াশায় মেসির সফর, ফের আলোচনায় ভয়াবহ বায়ুদূষণ সংকট

ভারতের রাজধানী দিল্লির আকাশে ঘন ধোঁয়াশা যখন জনজীবনকে কার্যত অচল করে দিয়েছে, ঠিক সেই সময়ই দেশটিতে সফরে আসেন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তার এই সফর দিল্লির দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ সংকটকে নতুন করে আন্তর্জাতিক নজরে এনে দেয়।

মেসির মাঠে নামার মুহূর্তে দর্শকদের উচ্ছ্বাস থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যালারি থেকে ভেসে ওঠে ‘একিউআই, একিউআই’ ধ্বনি। এই স্লোগান ছিল দিল্লির ভয়াবহ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুমান সূচকের প্রতি বিদ্রূপাত্মক ইঙ্গিত, যা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিল শহরের নতুন প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে।

দিল্লির বাতাস কতটা বিপজ্জনক
মেসির সফরের সময় টানা তিন দিন দিল্লির একিউআই ৪০০ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মানদণ্ডে ‘চরম ভয়াবহ’ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর মাসে দিল্লির বাতাসে এক দিন শ্বাস নেওয়া মানে প্রায় ছয়টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শুধু পরিবেশগত বায়ুদূষণের কারণে দিল্লিতে এক লক্ষের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটেছে বলে বিভিন্ন হিসাব উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোড়ন তোলে। মেসির ফুসফুস নিয়েও রসিকতা ও উদ্বেগ মেশানো পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে, যা শহরের বাস্তব সংকটকেই তুলে ধরে।

দূষণের মূল কারণ কী
দিল্লিতে সারা বছরই বায়ুদূষণ থাকে, তবে বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, কঠিন বর্জ্য পোড়ানো এবং উত্তর ভারতের কৃষকদের খড় পোড়ানোর ধোঁয়া একত্র হয়ে এই সংকট তৈরি করে।

নতুন সরকারের ব্যাখ্যা ও সমালোচনা
ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত বলেন, দূষণ একটি ‘পুরোনো সমস্যা’ যা তার সরকার উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, রাস্তা মেরামত, ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো ও অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তবে ফল পেতে সময় লাগবে।

বিরোধীরা অবশ্য এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক তারকার সফরের সময় দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি গোটা বিশ্বের সামনে ‘লজ্জাজনক চিত্র’ তুলে ধরেছে।

জরুরি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা
দূষণ বাড়ায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সর্বোচ্চ স্তরের গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান কার্যকর করা হয়। এর আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয় অনলাইনে পাঠদান, অফিসে অর্ধেক জনবল, নির্মাণকাজ বন্ধ এবং নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের বাইরে চলাচল কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক মিশনগুলোও তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে সমস্যা কোথায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লির দূষণ নিয়ন্ত্রণে মূল সমস্যা হলো ভুল অগ্রাধিকার। অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বড় ধুলিকণার দিকে নজর দিয়ে, অথচ সূক্ষ্ম পিএম ২.৫ কণা মানবদেহের জন্য বেশি ক্ষতিকর। শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, ডিজেল ও পেট্রলচালিত যান কমানো এবং কয়লার ব্যবহার হ্রাস না করলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

চীনের উদাহরণ সামনে
বিশেষজ্ঞরা বেইজিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। এক দশকে সেখানে পিএম ২.৫ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। পরিবহন সংস্কার, কয়লাভিত্তিক শিল্প বন্ধ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই এই পরিবর্তন এসেছে।

দিল্লির ভবিষ্যৎ কোথায়
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা যথেষ্ট ছিল না। জনসংখ্যা ও যানবাহন বাড়লেও দূষণ একই জায়গায় আটকে আছে, যা দেখায় যে আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া দিল্লির বাতাস শ্বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিজের হাতে শেখা থেকে জেনেভার মঞ্চে: চীনা ঘড়িনির্মাতা কিয়ান গুওবিয়াওর নতুন যাত্রা

দিল্লির ধোঁয়াশায় মেসির সফর, ফের আলোচনায় ভয়াবহ বায়ুদূষণ সংকট

০৯:১০:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের রাজধানী দিল্লির আকাশে ঘন ধোঁয়াশা যখন জনজীবনকে কার্যত অচল করে দিয়েছে, ঠিক সেই সময়ই দেশটিতে সফরে আসেন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তার এই সফর দিল্লির দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ সংকটকে নতুন করে আন্তর্জাতিক নজরে এনে দেয়।

মেসির মাঠে নামার মুহূর্তে দর্শকদের উচ্ছ্বাস থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যালারি থেকে ভেসে ওঠে ‘একিউআই, একিউআই’ ধ্বনি। এই স্লোগান ছিল দিল্লির ভয়াবহ এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুমান সূচকের প্রতি বিদ্রূপাত্মক ইঙ্গিত, যা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিল শহরের নতুন প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে।

দিল্লির বাতাস কতটা বিপজ্জনক
মেসির সফরের সময় টানা তিন দিন দিল্লির একিউআই ৪০০ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মানদণ্ডে ‘চরম ভয়াবহ’ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর মাসে দিল্লির বাতাসে এক দিন শ্বাস নেওয়া মানে প্রায় ছয়টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শুধু পরিবেশগত বায়ুদূষণের কারণে দিল্লিতে এক লক্ষের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু ঘটেছে বলে বিভিন্ন হিসাব উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোড়ন তোলে। মেসির ফুসফুস নিয়েও রসিকতা ও উদ্বেগ মেশানো পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে, যা শহরের বাস্তব সংকটকেই তুলে ধরে।

দূষণের মূল কারণ কী
দিল্লিতে সারা বছরই বায়ুদূষণ থাকে, তবে বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, কঠিন বর্জ্য পোড়ানো এবং উত্তর ভারতের কৃষকদের খড় পোড়ানোর ধোঁয়া একত্র হয়ে এই সংকট তৈরি করে।

নতুন সরকারের ব্যাখ্যা ও সমালোচনা
ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত বলেন, দূষণ একটি ‘পুরোনো সমস্যা’ যা তার সরকার উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তিনি দাবি করেন, রাস্তা মেরামত, ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো ও অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তবে ফল পেতে সময় লাগবে।

বিরোধীরা অবশ্য এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক তারকার সফরের সময় দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি গোটা বিশ্বের সামনে ‘লজ্জাজনক চিত্র’ তুলে ধরেছে।

জরুরি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা
দূষণ বাড়ায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সর্বোচ্চ স্তরের গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান কার্যকর করা হয়। এর আওতায় প্রাথমিক বিদ্যালয় অনলাইনে পাঠদান, অফিসে অর্ধেক জনবল, নির্মাণকাজ বন্ধ এবং নির্দিষ্ট যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের বাইরে চলাচল কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক মিশনগুলোও তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কবার্তা জারি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে সমস্যা কোথায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিল্লির দূষণ নিয়ন্ত্রণে মূল সমস্যা হলো ভুল অগ্রাধিকার। অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বড় ধুলিকণার দিকে নজর দিয়ে, অথচ সূক্ষ্ম পিএম ২.৫ কণা মানবদেহের জন্য বেশি ক্ষতিকর। শিল্প নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, ডিজেল ও পেট্রলচালিত যান কমানো এবং কয়লার ব্যবহার হ্রাস না করলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।

চীনের উদাহরণ সামনে
বিশেষজ্ঞরা বেইজিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। এক দশকে সেখানে পিএম ২.৫ প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। পরিবহন সংস্কার, কয়লাভিত্তিক শিল্প বন্ধ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই এই পরিবর্তন এসেছে।

দিল্লির ভবিষ্যৎ কোথায়
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা যথেষ্ট ছিল না। জনসংখ্যা ও যানবাহন বাড়লেও দূষণ একই জায়গায় আটকে আছে, যা দেখায় যে আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া দিল্লির বাতাস শ্বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়।