০২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান নিন্দা করল মেক্সিকো, ‘পরের টার্গেট’ হওয়া এড়াতে সতর্ক শেইনবাউম প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫১) সাত বিষয়ে ফেল করায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালা দিল বিএনপি নেতার ছেলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গলা কাটা অবস্থায় স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার রমজান বাজার স্থিতিশীল রাখতে ডাল ও ভোজ্যতেল আমদানির অনুমোদন সরকারের ভেনেজুয়েলার শান্তির নোবেলের বয়ান  শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় স্থবির উত্তরাঞ্চল, রংপুর মেডিক্যালে রোগীর চাপ বাড়ছে চুয়াডাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় মাছ ব্যবসায়ী নিহত ১৮৪ দেশ পেরিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস গড়লেন নাজমুন নাহার বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর পরিকল্পনা নেই: জাতিসংঘ

আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করছে—ভূগোলই ভাগ্য নির্ধারণ করে

কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের চার বছর পর আফগানিস্তান আবারও বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার এক অপ্রত্যাশিত মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেশটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব শেষ করেনি, বরং নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। একসময় যা ছিল সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্র, এখন তা হয়ে উঠেছে এমন এক সীমান্তভূমি, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রভাব, অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার ও কৌশলগত সুবিধার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। ভারত দূতাবাস পুনরায় খুলছে, পাকিস্তান শরণার্থী বহিষ্কার করছে, চীন শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের প্রস্তাব দিচ্ছে, আর রাশিয়া আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে। কাবুলকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোকেও টেনে আনছে। ফলে আফগানিস্তান হয়ে উঠেছে অঞ্চলে আমেরিকা-পরবর্তী ব্যবস্থার এক পরীক্ষাকেন্দ্র।

দুই দশক ধরে ভারত আফগানিস্তানে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছিল। অবকাঠামো ও পুনর্গঠনে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে দেশটি। সড়ক, বাঁধ, স্কুল ও আফগান পার্লামেন্ট ভবন—সবখানেই ছিল ভারতীয় উন্নয়ন সহায়তার ছাপ। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফিরে এলে নয়াদিল্লি প্রথমে সরে দাঁড়ায়, দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং উদ্বেগের সঙ্গে দেখে তাদের বিনিয়োগ এমন এক শাসনের হাতে যাচ্ছে, যাদের ওপর তাদের কখনোই আস্থা ছিল না।

অন্যদিকে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলে—অপূরণীয় প্রত্যাশা ও কৌশলগত ভুল হিসাবের গল্প। একসময় তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পররাষ্ট্রনীতির সম্পদ। বিদ্রোহের সময় ইসলামাবাদ আশ্রয়, কূটনৈতিক সহায়তা ও কৌশলগত গভীরতা দিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট—তালেবানশাসিত আফগানিস্তান হবে অনুগত প্রতিবেশী, যা পাকিস্তানের প্রভাব বাড়াবে এবং ভারতের উপস্থিতি মোকাবিলা করবে।

বাস্তবতা আরও জটিল প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিতর্কিত দুরান্ড লাইন সীমান্তে সশস্ত্র সংঘর্ষ দেখা গেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, আফগান ভূখণ্ড থেকে সীমান্তপারের হামলা চালানো হচ্ছে। তালেবান এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও পাকিস্তান জবাবে শক্ত অবস্থান নিয়েছে—গণহারে আফগান শরণার্থী বহিষ্কার, সীমান্ত বন্ধ এবং একসময় যাদের সমর্থন করেছিল সেই শাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতা।

এর অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক হয়েছে। বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া ও সীমান্ত বন্ধের ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনার পর পাকিস্তান মানবিক ও ট্রানজিট পথ পুনরায় খুলতে বাধ্য হয়। এই পিছু হটা ইসলামাবাদের জন্য এক তিক্ত সত্য তুলে ধরে—তালেবান কোনো প্রতিনিধি শক্তি নয়, তারা নিজেদের এজেন্ডাসহ সার্বভৌম অভিনেতা। ভূরাজনীতিতে শূন্যতার প্রতি আগ্রহ কম, আর এখানেই তৈরি হয়েছে এই বিদ্রূপ।

পাকিস্তানের প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের পরিমিত সম্পৃক্ততা কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। কাবুলে দূতাবাস পুনরায় খোলার ভারতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, একই সময়ে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়াদিল্লি সফর—সব মিলিয়ে এটি এক কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত। ২০২১ সালের পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। যুক্তি সহজ—ভারত সম্পৃক্ত না হলে পাকিস্তান আধিপত্য বিস্তার করবে এবং বহু দশকের নরম শক্তির বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাবে।

তবে ভারতের পথচলা সতর্কভাবে মাপা। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে বাস্তববাদী সহযোগিতা চলছে। এই কৌশলের পেছনে রয়েছে বড় লক্ষ্য—পূর্বের বিনিয়োগ রক্ষা করা, ইরানের চাবাহার বন্দর হয়ে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এক দেশে পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলা করা। তালেবানের জন্য ভারতের এই আগ্রহ একটি মূল্যবান সুযোগ—পাকিস্তানের গণ্ডির বাইরে বৈধতা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি। নয়াদিল্লি উপস্থিতি বাড়িয়ে দেখাচ্ছে, ভাঙাচোরা ভূরাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে বাস্তববাদই অনেক সময় জয়ী হয়।

ভারত সতর্কভাবে ফিরলেও পাকিস্তানের জন্য কাবুলে প্রভাব হারানো অস্তিত্বগত তাৎপর্য বহন করে। ভারতের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে বাফার হিসেবে ব্যবহারের যে ‘কৌশলগত গভীরতা’ ধারণা, তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। ভারত পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া এবং চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ার ফলে পাকিস্তান সেই দেশে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে, যাকে গড়ে তুলতে তারা দশকের পর দশক ব্যয় করেছে। এই টানাপোড়েন দেখায়, স্বার্থ ভিন্ন হলে গতকালের মিত্ররাই আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও আফগানিস্তান এখন পশ্চিমা-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলোর পথচলার এক পরীক্ষাক্ষেত্র। চীন দৃঢ়ভাবে এগিয়েছে—আফগান রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে নিজেকে প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। শিনজিয়াং নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও বেল্ট অ্যান্ড রোড সংযোগের আকর্ষণ বেইজিংয়ের আগ্রহের চালিকা শক্তি। ২০২৩ সালের জ্বালানি উত্তোলন চুক্তি গভীর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবায়ন থমকে গেছে। তবু চীনের উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাশিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। মধ্য এশিয়ায় সন্ত্রাসী হুমকি ঠেকানো ও পশ্চিমা প্রভাব সীমিত করার লক্ষ্য নিয়ে মস্কো তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া অল্প কয়েকটি শক্তির একটি। এই সম্পৃক্ততা রাশিয়ার বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন—নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হতে পারে বাগরাম বিমানঘাঁটির ভবিষ্যৎ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের স্নায়ুকেন্দ্র বাগরাম এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই ঘাঁটি পুনর্দখলের আহ্বান জানিয়েছেন, চীনের উত্থান মোকাবিলায় এটিকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়াসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো একসঙ্গে আফগানিস্তানে যেকোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করেছে, যা তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করে। এই বিরল ঐকমত্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে—আফগানিস্তান আঞ্চলিক ইস্যু, বাইরের শক্তির খেলার মাঠ নয়।

আফগানিস্তান আর প্রান্তিক নয়। এটি এখন সেই সম্মুখভাগ, যেখানে আঞ্চলিক ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণাগুলো মুখোমুখি হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান প্রভাব ও প্রবেশাধিকার নিয়ে লড়ছে। চীন ও রাশিয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে নিজেদের গেঁথে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও তালেবান এই প্রতিযোগিতা দক্ষতার সঙ্গে সামলাচ্ছে, নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে ছাড় ও স্বীকৃতি আদায় করছে।

আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহার আফগানিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব কমায়নি, বরং নতুনভাবে বণ্টন করেছে। দেশটি এখন দক্ষিণ এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চীনা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রুশ প্রভাব এবং অবশিষ্ট পশ্চিমা আগ্রহের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। কাবুলকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা শুধু আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নয়, আরব সাগর থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যও নির্ধারণ করবে। এই নতুন যুগে আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করছে—ভূগোলই শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান নিন্দা করল মেক্সিকো, ‘পরের টার্গেট’ হওয়া এড়াতে সতর্ক শেইনবাউম

আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করছে—ভূগোলই ভাগ্য নির্ধারণ করে

১১:৩৪:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের চার বছর পর আফগানিস্তান আবারও বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার এক অপ্রত্যাশিত মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন দেশটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব শেষ করেনি, বরং নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। একসময় যা ছিল সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্র, এখন তা হয়ে উঠেছে এমন এক সীমান্তভূমি, যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো প্রভাব, অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার ও কৌশলগত সুবিধার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। ভারত দূতাবাস পুনরায় খুলছে, পাকিস্তান শরণার্থী বহিষ্কার করছে, চীন শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের প্রস্তাব দিচ্ছে, আর রাশিয়া আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে। কাবুলকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোকেও টেনে আনছে। ফলে আফগানিস্তান হয়ে উঠেছে অঞ্চলে আমেরিকা-পরবর্তী ব্যবস্থার এক পরীক্ষাকেন্দ্র।

দুই দশক ধরে ভারত আফগানিস্তানে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছিল। অবকাঠামো ও পুনর্গঠনে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে দেশটি। সড়ক, বাঁধ, স্কুল ও আফগান পার্লামেন্ট ভবন—সবখানেই ছিল ভারতীয় উন্নয়ন সহায়তার ছাপ। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফিরে এলে নয়াদিল্লি প্রথমে সরে দাঁড়ায়, দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং উদ্বেগের সঙ্গে দেখে তাদের বিনিয়োগ এমন এক শাসনের হাতে যাচ্ছে, যাদের ওপর তাদের কখনোই আস্থা ছিল না।

অন্যদিকে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতার গল্প বলে—অপূরণীয় প্রত্যাশা ও কৌশলগত ভুল হিসাবের গল্প। একসময় তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পররাষ্ট্রনীতির সম্পদ। বিদ্রোহের সময় ইসলামাবাদ আশ্রয়, কূটনৈতিক সহায়তা ও কৌশলগত গভীরতা দিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট—তালেবানশাসিত আফগানিস্তান হবে অনুগত প্রতিবেশী, যা পাকিস্তানের প্রভাব বাড়াবে এবং ভারতের উপস্থিতি মোকাবিলা করবে।

বাস্তবতা আরও জটিল প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিতর্কিত দুরান্ড লাইন সীমান্তে সশস্ত্র সংঘর্ষ দেখা গেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছে, আফগান ভূখণ্ড থেকে সীমান্তপারের হামলা চালানো হচ্ছে। তালেবান এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও পাকিস্তান জবাবে শক্ত অবস্থান নিয়েছে—গণহারে আফগান শরণার্থী বহিষ্কার, সীমান্ত বন্ধ এবং একসময় যাদের সমর্থন করেছিল সেই শাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতা।

এর অর্থনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক হয়েছে। বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া ও সীমান্ত বন্ধের ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনার পর পাকিস্তান মানবিক ও ট্রানজিট পথ পুনরায় খুলতে বাধ্য হয়। এই পিছু হটা ইসলামাবাদের জন্য এক তিক্ত সত্য তুলে ধরে—তালেবান কোনো প্রতিনিধি শক্তি নয়, তারা নিজেদের এজেন্ডাসহ সার্বভৌম অভিনেতা। ভূরাজনীতিতে শূন্যতার প্রতি আগ্রহ কম, আর এখানেই তৈরি হয়েছে এই বিদ্রূপ।

পাকিস্তানের প্রভাব কমার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের পরিমিত সম্পৃক্ততা কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। কাবুলে দূতাবাস পুনরায় খোলার ভারতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, একই সময়ে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নয়াদিল্লি সফর—সব মিলিয়ে এটি এক কৌশলগত পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত। ২০২১ সালের পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। যুক্তি সহজ—ভারত সম্পৃক্ত না হলে পাকিস্তান আধিপত্য বিস্তার করবে এবং বহু দশকের নরম শক্তির বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে যাবে।

তবে ভারতের পথচলা সতর্কভাবে মাপা। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে বাস্তববাদী সহযোগিতা চলছে। এই কৌশলের পেছনে রয়েছে বড় লক্ষ্য—পূর্বের বিনিয়োগ রক্ষা করা, ইরানের চাবাহার বন্দর হয়ে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এক দেশে পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলা করা। তালেবানের জন্য ভারতের এই আগ্রহ একটি মূল্যবান সুযোগ—পাকিস্তানের গণ্ডির বাইরে বৈধতা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি। নয়াদিল্লি উপস্থিতি বাড়িয়ে দেখাচ্ছে, ভাঙাচোরা ভূরাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে বাস্তববাদই অনেক সময় জয়ী হয়।

ভারত সতর্কভাবে ফিরলেও পাকিস্তানের জন্য কাবুলে প্রভাব হারানো অস্তিত্বগত তাৎপর্য বহন করে। ভারতের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে বাফার হিসেবে ব্যবহারের যে ‘কৌশলগত গভীরতা’ ধারণা, তা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে। ভারত পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া এবং চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ার ফলে পাকিস্তান সেই দেশে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে, যাকে গড়ে তুলতে তারা দশকের পর দশক ব্যয় করেছে। এই টানাপোড়েন দেখায়, স্বার্থ ভিন্ন হলে গতকালের মিত্ররাই আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও আফগানিস্তান এখন পশ্চিমা-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলোর পথচলার এক পরীক্ষাক্ষেত্র। চীন দৃঢ়ভাবে এগিয়েছে—আফগান রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে নিজেকে প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। শিনজিয়াং নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও বেল্ট অ্যান্ড রোড সংযোগের আকর্ষণ বেইজিংয়ের আগ্রহের চালিকা শক্তি। ২০২৩ সালের জ্বালানি উত্তোলন চুক্তি গভীর অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবায়ন থমকে গেছে। তবু চীনের উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাশিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। মধ্য এশিয়ায় সন্ত্রাসী হুমকি ঠেকানো ও পশ্চিমা প্রভাব সীমিত করার লক্ষ্য নিয়ে মস্কো তালেবান শাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া অল্প কয়েকটি শক্তির একটি। এই সম্পৃক্ততা রাশিয়ার বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন—নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হতে পারে বাগরাম বিমানঘাঁটির ভবিষ্যৎ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের স্নায়ুকেন্দ্র বাগরাম এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই ঘাঁটি পুনর্দখলের আহ্বান জানিয়েছেন, চীনের উত্থান মোকাবিলায় এটিকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করে। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়াসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো একসঙ্গে আফগানিস্তানে যেকোনো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাখ্যান করেছে, যা তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করে। এই বিরল ঐকমত্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে—আফগানিস্তান আঞ্চলিক ইস্যু, বাইরের শক্তির খেলার মাঠ নয়।

আফগানিস্তান আর প্রান্তিক নয়। এটি এখন সেই সম্মুখভাগ, যেখানে আঞ্চলিক ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণাগুলো মুখোমুখি হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান প্রভাব ও প্রবেশাধিকার নিয়ে লড়ছে। চীন ও রাশিয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে নিজেদের গেঁথে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও তালেবান এই প্রতিযোগিতা দক্ষতার সঙ্গে সামলাচ্ছে, নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে ছাড় ও স্বীকৃতি আদায় করছে।

আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহার আফগানিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব কমায়নি, বরং নতুনভাবে বণ্টন করেছে। দেশটি এখন দক্ষিণ এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চীনা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রুশ প্রভাব এবং অবশিষ্ট পশ্চিমা আগ্রহের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। কাবুলকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতা শুধু আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নয়, আরব সাগর থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যও নির্ধারণ করবে। এই নতুন যুগে আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করছে—ভূগোলই শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণ করে।