বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ও গৌরবময় সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাজমুন নাহার। বিশ্বের ১৮৪টি দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম নারী পর্যটকদের একটি অত্যন্ত সীমিত বৈশ্বিক তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছেন।
বাহামা সফরের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছেন নাজমুন নাহার। সেখানে বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস তাঁর এই অসাধারণ অর্জনের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান।
সাম্প্রতিক বিশ্বভ্রমণ ও গন্তব্যসমূহ
২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নাজমুন নাহারের সর্বশেষ ভ্রমণপর্বে অন্তর্ভুক্ত ছিল ওশেনিয়ার সামোয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিমুর-লেস্তে, ক্যারিবিয়ানের অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা ও শেষ গন্তব্য বাহামা। এই যাত্রার মাধ্যমে তিনি ১৮৪টি দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেন।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয়
লাল-সবুজের পতাকা হাতে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছুটে বেড়িয়ে নাজমুন নাহার শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডই গড়েননি, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রা সাহস, অধ্যবসায় ও অনুপ্রেরণার এক স্থায়ী উদাহরণ হয়ে থাকবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
ভ্রমণের শুরু ও সংগ্রামের গল্প
নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের সূচনা হয় ২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অ্যাডভেঞ্চার কর্মসূচির মাধ্যমে। একক ভ্রমণকারী হিসেবে তিনি অধিকাংশ দেশ সড়কপথে ঘুরেছেন। এই পথে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে কঠিন পরিবেশ, চরম আবহাওয়া এবং জীবনঝুঁকিপূর্ণ নানা পরিস্থিতির। তবুও তাঁর যাত্রা থেমে থাকেনি। এখনও যে কয়েকটি দেশ বাকি রয়েছে, সেগুলোতেও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও গণমাধ্যমে উপস্থিতি
নাজমুন নাহারের ভ্রমণকাহিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। ভেনেজুয়েলার লা নাসিওন, ক্যারিবিয়ানের উইক নিউজ, তিমুর-লেস্তের সুয়ারা তিমুর লোরোসায়ে এবং পর্তুগালের লুসা সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর সাফল্যের গল্প প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নানা প্ল্যাটফর্মে তাঁর অধ্যবসায় ও অনুপ্রেরণামূলক কাজ তুলে ধরা হয়েছে।
ভ্রমণের মাধ্যমে বার্তা
বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি নাজমুন নাহার আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পক্ষে শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। ভেনেজুয়েলা সফর প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। অসংখ্য পুলিশি তল্লাশি পেরিয়ে ১৭টি শহর ঘোরা, আন্দিজ পর্বতমালা, সবুজ উপত্যকা, নির্মল সমুদ্র, মরুভূমির দৃশ্য ও স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা তাঁকে প্রকৃতির এক অনন্য কোলাজ উপহার দিয়েছে। সামোয়া থেকে বাহামা পর্যন্ত প্রতিটি দেশেই ছিল চ্যালেঞ্জ, আবার ছিল অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

মাইলফলক ও সম্মাননা
নাজমুন নাহার ২০১৮ সালের জুনে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে সফরের মাধ্যমে শততম দেশ, ২০২১ সালের অক্টোবরে সাও তোমে ও প্রিন্সিপেতে দেড়শতম দেশ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১৭৫তম দেশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে ১৮৪তম দেশের মাইলফলক স্পর্শ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি পিস টর্চ বেয়ারার অ্যাওয়ার্ডসহ পেয়েছেন অর্ধশতাধিক সম্মাননা ও পুরস্কার।
শিক্ষা ও বর্তমান কাজ
লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্ম নেওয়া নাজমুন নাহার উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন সুইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। মানবাধিকার ও এশিয়া বিষয়ক পড়াশোনায় ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি বর্তমানে গবেষক, অনুপ্রেরণামূলক বক্তা ও শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর লক্ষ্য, বিশ্বের শিশু ও তরুণদের সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















