ওলেগ ল্যালিনের জন্য লন্ডনে পোস্টিং ছিল স্বপ্নের মতো। বাল্টিক সাগরঘেঁষা ক্লাইপেদায় একঘেয়ে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৯ সালে তিনি যাচ্ছিলেন তথাকথিত ‘সুইংগিং লন্ডন’-এ। প্রকাশ্যে তিনি ছিলেন সোভিয়েত বাণিজ্য মিশনের সদস্য। বাস্তবে তিনি কাজ করতেন কেজিবির বিভাগ পাঁচে, যে শাখা নাশকতা ও গুপ্তহত্যার মতো গোপন অভিযানে বিশেষজ্ঞ ছিল। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এই মানুষটি পরিণত হন শীতল যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পলাতক চরিত্রে, যার দেওয়া তথ্য ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ফাইভের ভাগ্য ঘুরিয়ে দেয়।
লন্ডনে কেজিবির গোপন মুখ
ল্যালিন ছিলেন মদ্যপ ও নারীকেন্দ্রিক জীবনে অভ্যস্ত। লন্ডনে পৌঁছানোর পরও তার জীবনযাপন ছিল বেপরোয়া। কিন্তু আড়ালে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন কেজিবির গোপন কর্মকাণ্ডে। তার দায়িত্ব ছিল ব্রিটেনে সোভিয়েত গোপন নেটওয়ার্ককে সহায়তা করা এবং প্রয়োজন হলে নাশকতার প্রস্তুতি রাখা।

পালানোর সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ
পরবর্তীকালে প্রকাশ্যে আসা গোপন নথির ভিত্তিতে লেখক রিচার্ড কেরবাজ দেখিয়েছেন, ল্যালিনের পলায়নের পেছনে আদর্শিক কোনো বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল পুরোপুরি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তিনি একদিন সরাসরি থানায় গিয়ে নিজেকে কেজিবি কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। তার লক্ষ্য ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কৃত হওয়া, যাতে দেশে ফিরে নিজেকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন এবং স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। সে সময় তিনি আরও পাঁচজন নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। বিনিময়ে তিনি এমআই ফাইভকে ব্রিটেনে কেজিবির কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার এবং মস্কো ফিরে গিয়েও সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
গ্রেপ্তার ও চূড়ান্ত ভাঙন
কয়েক মাস পর টটেনহ্যাম কোর্ট রোডে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, চিৎকার ও গালাগালির অভিযোগে পুলিশ ল্যালিনকে গ্রেপ্তার করে। একই সময়ে তার ক্ষুব্ধ স্ত্রী মস্কোতে কেজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর ফল হয় ভয়াবহ। ল্যালিনকে দ্রুত দেশে ফিরে ‘কঠোর প্রশাসনিক শাস্তি’র মুখোমুখি হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন তার সামনে একটাই পথ খোলা থাকে—সম্পূর্ণভাবে পলায়ন।

গণ বহিষ্কার ও এমআই ফাইভের পুনরুত্থান
পলায়নের তিন সপ্তাহের মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার ১০৫ জন সোভিয়েত গুপ্তচরকে একযোগে দেশছাড়া করার নির্দেশ দেয়। লেখকের মতে, এই ঘটনাই কার্যত এমআই ফাইভকে রক্ষা করেছিল। হয়তো কথাটি কিছুটা অতিরঞ্জিত, তবে এতে সন্দেহ নেই যে ১৯৬৩ সালে কিম ফিলবি কেলেঙ্কারির পর যে আস্থাহীনতায় সংস্থাটি ভুগছিল, ল্যালিনের দেওয়া তথ্য তা কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখে।
আজকের প্রেক্ষাপটে ল্যালিনের গল্প
গোয়েন্দা যুদ্ধের কৌশল বদলেছে, কিন্তু ল্যালিনের গল্প এখনো প্রাসঙ্গিক। বর্তমান রাশিয়ার নেতৃত্ব পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে একই ধরনের ধূসর অঞ্চলের অভিযান চালাচ্ছে, যা একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন করত। সম্প্রতি এমআই সিক্সের বিদায়ী প্রধান স্যার রিচার্ড মুর স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, বহু কার্যকর গুপ্তচর স্বেচ্ছায় সামনে এসেছেন এবং ভবিষ্যতেও সেই দরজা খোলা থাকবে।
এই গল্প শুধু অতীতের নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের গুপ্তচর রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















