ব্রাজিলের মধ্যভাগের উঁচু ভূমিতে ছোট শহর কাতালাও। শহরের কেন্দ্র পেরিয়ে গ্রামীণ পথ ধরে এগোলেই বিস্তৃত খনি অঞ্চল। এখানেই প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছে একটি চীনা খনি সংস্থা, যা স্থানীয় সমাজকে সঙ্গে নিয়েই নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। খনির উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিশ্বাস ও সহাবস্থানের গল্প।
স্থানীয় বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা
দুই হাজার ষোলো সালে ব্রিটিশ মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নায়োবিয়াম ও ফসফেট খনি কেনার পর সংস্থাটি দ্রুতই ব্রাজিলে বড় উৎপাদক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরে উৎপাদন ও আয় রেকর্ড ছুঁয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, এই সাফল্যের পেছনে কেবল খনিজ সম্পদ নয়, রয়েছে ব্যবস্থাপনার বড় পরিবর্তন। ব্রাজিলের কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সামাজিক অংশগ্রহণ আর পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ।
কমিউনিটির সঙ্গে গাঁথা উদ্যোগ
খনি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নার্সারি, গ্রামীণ উপাসনালয় সংস্কার, সড়ক মেরামত আর একটি সৃজনশীল কেন্দ্র। এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই পরিচালনা করেন স্থানীয় কর্মীরা। কর্তৃপক্ষের ভাষায়, খনি গ্রামাঞ্চলে হওয়ায় আশপাশের মানুষই তাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। তাই সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাভিত্তিক নানা সামাজিক প্রকল্পে নিয়মিত বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
স্বনির্ভরতার দিকে লক্ষ্য
নার্সারি প্রকল্পে শুরুতে অবকাঠামো, বীজ ও পুঁজি দেওয়া হলেও লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা। স্থানীয় নারীরা সেখানে দেশি গাছের চারা উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি করছেন। একইভাবে গ্রামীণ সড়ক ও উপাসনালয়ের উন্নয়ন ছোট বিনিয়োগ হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।
স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির পাশে দাঁড়ানো
গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা সেবার অভাব মেটাতে চালু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ইউনিট। নির্দিষ্ট সূচিতে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। শহরের ভেতরে সৃজনশীল কেন্দ্রটিতে নৃত্য, সংগীত, তথ্যপ্রযুক্তি শেখানো হয় বিনামূল্যে। তরুণদের মাদক ও সহিংসতা থেকে দূরে রাখতে সচেতনতামূলক কর্মশালাও চলছে।

ব্যবস্থাপনায় বড় বদল
প্রথম দিকে দেশীয় কিংবা অন্য অঞ্চলের মডেল প্রয়োগ করে সফলতা আসেনি। পরে সিদ্ধান্ত হয়, স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মানানসই একটি অভিন্ন মূল্যবোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে। ফলে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা কমেছে, বেড়েছে স্থানীয়দের দায়িত্ব। এতে উৎপাদন দক্ষতা যেমন বেড়েছে, তেমনি আস্থা তৈরি হয়েছে।
কঠিন প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রক লড়াই
নায়োবিয়াম উত্তোলনের প্রযুক্তি জটিল। আকরিকের গুণগত মান বাড়াতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া লাগে, সঙ্গে মৌসুমি বৃষ্টিতে যন্ত্রপাতির ক্ষয়ও বেশি। আবার সামান্য বাঁধ উঁচু করতেও বছরের পর বছর অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিটি ধাপে পরিবেশ, প্রত্নতত্ত্ব আর প্রাণী চলাচলের বিষয় মাথায় রাখতে হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণই শেষ পর্যন্ত অনুমোদন নিশ্চিত করেছে।
লাতিন আমেরিকায় বিস্তারের ভিত্তি
ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা এখন নতুন প্রকল্পে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইকুয়েডরে স্বর্ণখনি এবং ব্রাজিলেই আরও খনি কেনার উদ্যোগ চলছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্রাজিলে শেখা আইন, কর, সামাজিক ও পরিবেশগত জ্ঞানই তাদের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের মূল শক্তি।
দশ বছরের পথচলা ফিরে দেখা
শুরুতে প্রতিটি পদক্ষেপ কঠিন ছিল বলে জানান কর্মকর্তারা। এখন পেছনে তাকালে মনে হয়, সময় দ্রুতই কেটে গেছে। কাতালাওয়ের খনি প্রকল্প তাই শুধু উৎপাদনের গল্প নয়, বরং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিলে বেড়ে ওঠার এক দশকের অভিজ্ঞতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















