মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফলে দেশটির তেল রপ্তানি দ্রুতই আবার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে এবং চীন থেকে সরে আসবে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলো। তবে লাতিন আমেরিকার এই দেশে উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।
শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, আপাতত নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র “একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য” ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে, যা ইঙ্গিত দেয় যে খুব শিগগিরই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে।
ওয়াশিংটন যখন কারাকাসের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছিল, তখন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বৈশ্বিক তেলের মানদণ্ডমূল্য কিছুটা বেড়েছিল। তবে নতুন করে রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটলেও বৈশ্বিক তেলবাজারে এর প্রভাব সীমিতই থাকবে, বিশেষ করে ২০২৬ সালে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়।
এক সময়ের বড় উৎপাদক ভেনেজুয়েলা গত বছর দিনে মাত্র প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের এক শতাংশেরও কম। ব্যর্থ সরকারি নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের পর বছর বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এতে ভেনেজুয়েলার জীর্ণ তেল খাত কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল শোধন মানচিত্র নতুন করে আঁকা হবে।
শোধনাগারের পথে বড় পরিবর্তন
কারাকাসে মসৃণ রাজনৈতিক রূপান্তর হলে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি দ্রুত নতুন পথে ঘুরে যাবে এবং দেশটির প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবার যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত তেল শোধনাগারগুলো বহু আগেই ভারী মানের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য নির্মিত হয়েছিল, যা থেকে গ্যাসোলিন, ডিজেল ও জেট জ্বালানি তৈরি হয়—এই ধরনের তেলই ভেনেজুয়েলা রপ্তানি করে।
২০১০-এর দশকের শুরুতে দেশীয় শেল তেলের উত্থানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মিশ্রণে বড় পরিবর্তন এলেও বহু শোধনাগার এখনো কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভারী মানের তেলের ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে পৌঁছায়, যা দেশটির মোট উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ ছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা থেকে ভারী তেলের সরবরাহ বাড়ায় এই প্রবাহ কমতে থাকে এবং ২০১৮ সালে তা নেমে আসে দৈনিক ৫ লাখ ৬ হাজার ব্যারেলে।
২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত পিডিভিএসএর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কার্যত শূন্যে নেমে যায়। তবে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র শেভরনকে দেশটিতে যৌথ উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ায় ২০২৪ সালে রপ্তানি আবার বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ২ লাখ ২৭ হাজার ব্যারেলে এবং ২০২৫ সালের প্রথম ১০ মাসে ছিল প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল।
চীনের জন্য বড় ধাক্কা
ভেনেজুয়েলার রপ্তানি পথ বদলালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর চীনই ভেনেজুয়েলার প্রধান তেল আমদানিকারকে পরিণত হয়েছিল। বিশ্লেষণ সংস্থা ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভেনেজুয়েলার দৈনিক ৭ লাখ ৬৮ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির অর্ধেকের বেশি গেছে চীনে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সরকার থাকলেও চীন কিছু ভেনেজুয়েলা তেল পেতে পারে, তবে সেই পরিমাণ সীমিতই থাকবে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, চীনে যাওয়া ভেনেজুয়েলার তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যায় তথাকথিত ‘টিপট’ নামে পরিচিত স্বাধীন শোধনাগারগুলোতে, যারা বড় ছাড়ে তেল কিনতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে।
নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারদরে তেল বিক্রি হবে, ফলে এই ক্রেতাদের জন্য ছাড়ের সুবিধা আর থাকবে না। বাকি এক-তৃতীয়াংশ তেল যায় বেইজিংয়ের কাছে ভেনেজুয়েলার বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দামে সরবরাহ করা হয়। এই বাণিজ্য ভবিষ্যতে থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় এবং পরিবহন খরচ কম থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের জন্য চীনের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক বাজার। বর্তমানে চীনের ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোতে যাওয়া তেলের বড় অংশ যদি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসে, তবে কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি দৈনিক ২ লাখ ব্যারেলের বেশি বাড়তে পারে, যা ২০২৫ সালের রপ্তানি মাত্রা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয় দ্বিগুণেরও বেশি হবে।
ধীরগতির উৎপাদন পুনর্গঠন
রপ্তানির পথ দ্রুত বদলালেও ভেনেজুয়েলার উৎপাদন ও রপ্তানি অর্থপূর্ণভাবে বাড়তে সময় লাগবে। ট্রাম্প বলেছেন, বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো আবার ভেনেজুয়েলায় ফিরে এসে জ্বালানি খাত পুনরুজ্জীবিত করবে। বিশ্বের প্রমাণিত সর্ববৃহৎ তেল ও গ্যাস মজুত—প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল—ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
১৯২০-এর দশক থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল আবিষ্কার ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, যার ফলে ১৯৩০-এর দশকে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকে ও পরে হুগো চাভেজের শাসনামলে শিল্প জাতীয়করণের কারণে শেভরন, এক্সনমোবিল ও শেলের মতো পশ্চিমা কোম্পানিগুলো সরে যেতে বাধ্য হয়।
স্থিতিশীলতার প্রয়োজন
এর ফলে ১৯৭০ সালে দৈনিক ৩৭ লাখ ব্যারেলের উৎপাদন ২০২১ সালে নেমে আসে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ব্যারেলে। ২০২৪ সালে সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও আগের অবস্থায় ফেরার পথ দীর্ঘ।
পশ্চিমা কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার স্বল্প খরচের বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে আগ্রহী হলেও তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নতুন প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাবে না। পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ ভেনেজুয়েলার কাছে এক্সন, কনোকোফিলিপস ও শেভরনের বিপুল বকেয়া রয়েছে, যা মেটানো ছাড়া বড় বিনিয়োগ কঠিন।
রাজনৈতিক, আইনি ও আর্থিক বাধা কাটলেও নতুন তেল ও গ্যাস প্রকল্প বাস্তবায়নে বহু বছর লাগবে। র্যাপিডান এনার্জির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রথম বছরে উৎপাদন দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতে এক দশকে তা ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।
ট্রাম্পের নাটকীয় পদক্ষেপে ভেনেজুয়েলার তেল খাত তাৎক্ষণিকভাবে বদলে না গেলেও বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—বৈশ্বিক জ্বালানি খেলার নিয়ম বদলে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















