আফগানিস্তান জানিয়েছে, পাকিস্তান তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা বাগরাম বিমানঘাঁটিতে বিমান হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে আফগান বাহিনী তা প্রতিহত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান যে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে, তার মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু।
বাগরামে ভোরের হামলার চেষ্টা
রোববার ভোর প্রায় ৫টার দিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধবিমান বাগরাম বিমানঘাঁটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে বোমা হামলার চেষ্টা চালায় বলে জানান পারওয়ান প্রদেশের পুলিশ মুখপাত্র ফজল রহিম মেসকিনইয়ার।
তিনি বলেন, আফগান বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
তালেবান সরকারের মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত এবং আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ঘাঁটিটি ‘আকাশপথে আগ্রাসনের’ শিকার হয়েছে। তবে হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বাগরামের কৌশলগত গুরুত্ব
বাগরাম বিমানঘাঁটি ছিল আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করলে তালেবান এই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
২০২৫ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাগরাম ত্যাগ করা উচিত হয়নি এবং তিনি এটি পুনরুদ্ধার করতে চান। তার মতে, ঘাঁটিটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চীনের পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
কাবুল থেকে প্রায় ২৫ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে রয়েছে বিশাল দুটি রানওয়ে। এর একটি ১১ হাজার ৮০০ ফুট দীর্ঘ, যা ভারী যুদ্ধবিমান ও পরিবহন বিমান অবতরণের উপযোগী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আফগান সরকার ঘাঁটিটি সীমিতভাবে ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। আফগান জাতীয় বিমান সংস্থার মহাপরিচালক বখতুর রহমান শরাফত সামাজিক মাধ্যমে বলেন, “বাগরামে আমাদের কোনো অস্ত্র বা বাহিনী নেই।”
পাকিস্তানের বিস্তৃত সামরিক অভিযান
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ডজনখানেক ছোট সামরিক ঘাঁটি, গোলাবারুদ ভাণ্ডার ও চৌকিতে হামলা চালিয়েছে। তারা ঘোষণা করেছে যে তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে তারা ‘খোলা যুদ্ধে’ নেমেছে।
তবে বাগরামকে লক্ষ্যবস্তু করা পরিস্থিতির নতুন মোড় নির্দেশ করে। এর আগে পাকিস্তানের হামলা বড় অবকাঠামো বা প্রতীকী স্থাপনায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর প্রতি বছর বাগরামের রানওয়েতে সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করে তাদের শক্তি প্রদর্শন করে আসছে। ফলে ঘাঁটিটি শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্ত উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলা
গত কয়েক মাস ধরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা চলছে। পাকিস্তান দাবি করেছে, তালেবান সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান নামের জঙ্গি সংগঠনকে সমর্থন দিচ্ছে, যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত পাকিস্তানি নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করেছে।
আফগানিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা স্বীকার করেছে যে ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান করছে।
১,৬০০ মাইল দীর্ঘ যৌথ সীমান্তজুড়ে আফগান বাহিনীও পাকিস্তানি চৌকিতে হামলা চালিয়েছে। রোববার কাবুলেও পাকিস্তান বিমান হামলা চালায়। ছয় মিলিয়ন মানুষের শহরে রমজানের রোজা শুরুর সময় বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। রাতেও কাবুলের কেন্দ্রস্থলে ভারী বিমানবিধ্বংসী গোলাবর্ষণ শোনা গেছে।
রমজান মাসে যুদ্ধবিরতির আহ্বান প্রতিবেশী দেশগুলো জানালেও উভয় পক্ষ তা উপেক্ষা করেছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বাগরামে হামলার চেষ্টা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন শহর ও স্থাপনায় সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগান সামরিক অবকাঠামোয় আরও হামলা হলে তালেবানপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর পাল্টা আক্রমণ বাড়তে পারে। পাকিস্তানের সামরিক শক্তি আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক বড় হলেও তাদের এই অভিযানের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট নয়।
লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও সামরিক বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা প্রশ্ন তুলেছেন, “পাকিস্তান বিমান হামলা চালাতে পারে, কিন্তু এরপর কী? তারা কি আফগানিস্তানকে বাগরাম ছাড়তে বাধ্য করতে চায়? এই অভিযানের শেষ কোথায়, তা পরিষ্কার নয়।”
এদিকে তালেবান সরকার ট্রাম্পের বাগরাম পুনর্দখলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের সামরিক উপস্থিতি ছিল ব্যর্থ নীতি। তবে সামরিক উপস্থিতি ছাড়া সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়তে তারা আগ্রহী।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















