যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর নিয়ে দেশটির বিরোধী দলগুলো তীব্র প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, এমন সময়ে এই সফর “অপ্ররোচিত আগ্রাসনের প্রতি নীরব সমর্থন” হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মোদির ইসরায়েল সফর ও প্রাথমিক মন্তব্য
গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার মোদি এক বিরল রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরায়েলে ছিলেন। সফরকালে তিনি গাজা শান্তি উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান এবং বলেন, “পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ সরাসরি যুক্ত।”
এই মন্তব্যগুলো করা হয় হামলার আগে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন।

হামলার পর মোদির প্রতিক্রিয়া
সোমবার হামলার পর মোদি জানান, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “ভারত দ্রুত সংঘর্ষবিরতির প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করছে।”
এর আগে রবিবার গভীর রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে তার ফোনালাপের কথা জানান মোদি। সেখানে তিনি আমিরাতে ইরানি বাহিনীর হামলার তীব্র নিন্দা জানান, যদিও পোস্টে তেহরানের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। তিনি নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং কঠিন সময়ে আমিরাতের পাশে থাকার কথা বলেন। পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত ভারতীয়দের দেখভালের জন্য আমিরাত সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
কংগ্রেসের কড়া প্রতিক্রিয়া

ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস স্পষ্ট ভাষায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার “লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড” নিন্দা করেছে। দলটির পররাষ্ট্রবিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এমন সময়ে মোদির ইসরায়েল সফর সামরিক উত্তেজনাকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করার বার্তা দিতে পারে।
তাদের মতে, পক্ষপাতমূলক অবস্থান ও নীরব সমর্থনের ধারণা ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যার গুরুতর কৌশলগত পরিণতি হতে পারে।
কংগ্রেস আরও জানায়, ভারতের সঙ্গে শুধু ইসরায়েল নয়, ইরান, ফিলিস্তিন ও পুরো অঞ্চলের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, জ্বালানি, ভূরাজনৈতিক ও প্রবাসী সম্পর্ক রয়েছে। তাই সরকারকে এই বিস্তৃত সম্পর্কের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
চাবাহার বন্দর ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
ইরানে হামলার প্রেক্ষাপটে ভারতের চাবাহার বন্দর প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই বন্দর ভারত উন্নয়ন ও পরিচালনা করছে, যা পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তান ও জ্বালানিসমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দরের পাল্টা কৌশল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ভারতের তেল আমদানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পারস্য উপসাগর থেকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ৯০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক বসবাস ও কাজ করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
অন্যান্য বিরোধী নেতাদের বক্তব্য
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেন, গত কয়েক মাসের সামরিক প্রস্তুতি দেখে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা প্রত্যাশিত ছিল। তার অভিযোগ, এমন পরিস্থিতিতেও মোদি ইসরায়েল সফরে গিয়ে “নৈতিক দুর্বলতার” পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, মোদির দুই “ঘনিষ্ঠ বন্ধু” যুদ্ধ শুরু করার প্রেক্ষাপটে এই সফর আরও বিব্রতকর।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) আগেই মোদির ইসরায়েল সফরের বিরোধিতা করেছিল। দলটি বলেছে, সফর শেষ হওয়ার পরপরই ইরানে হামলা হয়েছে। তাই সরকারকে স্পষ্টভাবে এই হামলার নিন্দা করতে এবং অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধের দাবি জানাতে হবে।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, এই সফর ছিল “অত্যন্ত অনুপযুক্ত সময়ে” নেওয়া সিদ্ধান্ত। তার প্রশ্ন, ইসরায়েল কি আগেই হামলার পরিকল্পনার কথা মোদিকে জানিয়েছিল? যদি জানিয়ে থাকে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সফর বাতিল করে দেশে ফেরা উচিত ছিল। আর যদি না জানিয়ে থাকে, তবে তা ভারতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।

এশিয়ায় প্রতিক্রিয়া
এই হামলার প্রভাব এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ ইসলামী পণ্ডিত সংগঠন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এই সদস্যপদ ফিলিস্তিনের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনে কার্যকর নয়।
প্রতিবেশী পাকিস্তানে খামেনির মৃত্যুর পর একাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২২ জন নিহত হন। ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বিক্ষোভকারীরা ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দেন।
সমগ্র পরিস্থিতি ভারতের জন্য এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ—সবকিছুকে একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















