পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন বার্তা
দীর্ঘ বিরতির পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন শুধু একটি নির্বাচনই ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পাস রাজনীতির শক্তি ও দিকনির্দেশনার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় নিরঙ্কুশভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। জকসুর সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সহসাধারণ সম্পাদক—শীর্ষ তিন পদেই তাদের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের রায়ের।
ফল ঘোষণার রাত এবং ভোটের চিত্র

বুধবার রাত সাড়ে ১১টার পর একে একে ৩৮টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, সহসভাপতি পদে ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম পেয়েছেন পাঁচ হাজার পাঁচ শতাধিক ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্রার্থী এ কে এম রাকিবের সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় নয়শ।
সাধারণ সম্পাদক পদে ব্যবধান আরও বড়। আব্দুল আলিম আরিফ পাঁচ হাজার চার শতাধিক ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন দুই হাজারের কিছু বেশি ভোট। সহসাধারণ সম্পাদক পদেও শিবির সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ রানা পাঁচ হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেন।
এই তিনটি পদেই ভোটের ব্যবধান দেখিয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ফল নির্ধারিত হয়েছে সুস্পষ্ট ব্যবধানে।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই থেকে পিছিয়ে পড়া
নির্বাচনের শুরুতে চিত্র ছিল ভিন্ন। প্রথম ভাগে ঘোষিত কয়েকটি কেন্দ্রের ফলে ভিপি, জিএস ও এজিএস—তিন পদেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যায়। ছাত্রদল ও ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেলের প্রার্থীরা তখন পর্যন্ত শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। তবে পরবর্তী কেন্দ্রগুলোর ফল যোগ হতে থাকলে ব্যবধান বাড়তে থাকে এবং রাত গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিবির সমর্থিত প্যানেলের জন্য।
ভোটগ্রহণ, গণনা ও অংশগ্রহণ
মঙ্গলবার বিকাল চারটায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যায় শুরু হয় গণনা। মাঝপথে কিছু কারিগরি ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় গণনা বন্ধ থাকলেও গভীর রাতে আবার শুরু হয়ে পরদিন বুধবার পর্যন্ত চলে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ষোল হাজার ভোটারের মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ভোট পড়ে প্রায় ছেষট্টি শতাংশ।
ছাত্রদের আলাদা হল না থাকায় হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় কেবল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে। সেখানে বারো শতাধিক ভোটার তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।

ধারাবাহিক সাফল্যের রাজনীতি
জকসু নির্বাচনের ফল আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এর আগে ডাকসু, জাকসু, চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে একই ধরনের ফলাফল এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো আবার শুরু হয়েছে, আর সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই শিবির সমর্থিত প্যানেল শীর্ষ পদগুলোতে জয় পেয়েছে।
জকসুর ফল সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও দৃঢ় করেছে। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ক্যাম্পাস রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকছে—তারও ইঙ্গিত বহন করে।
শিক্ষার্থীদের রায় ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
এই নির্বাচনে চারটি প্যানেল অংশ নিলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ ছিল দুই পক্ষের মধ্যে। তবু ভোটের ব্যবধান দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ সুসংগঠিত নেতৃত্ব, স্পষ্ট কর্মসূচি ও ধারাবাহিক রাজনীতির পক্ষেই রায় দিয়েছে।
এখন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা নতুন নেতৃত্ব কীভাবে শিক্ষার্থীদের অধিকার, আবাসন সংকট, শিক্ষা পরিবেশ ও ক্যাম্পাস নিরাপত্তার মতো বাস্তব সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে। জকসুর এই পূর্ণ প্যানেল জয় তাই শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং নতুন দায়িত্ব ও পরীক্ষার সূচনাও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















