মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এ বছর ইউরোপীয়দের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসেনি। বরং অনেকেই মেনে নিয়েছেন, পুরোনো সুদিন আর ফিরবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যখন আমেরিকাকে চিরকালীনভাবে “ইউরোপের সন্তান” বলে উল্লেখ করেন, তখন হয়তো কয়েকজন আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশই অন্তর্নিহিত বার্তাটি বুঝেছেন—এখন থেকে ইউরোপকে নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।
রুবিওর পরিমিত ভাষা আর গত বছরের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের সরাসরি মন্তব্যের মধ্যে পার্থক্য মূলত শব্দচয়নের। এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের ভাষায়, পুরোনো যুগ শেষ—এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। এখন নিজেদের দেখভাল নিজেরাই করতে হবে। রুবিও ও ভ্যান্স আসলে একই কথাই বলেছেন।
প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া ইউরোপ
মিউনিখ, বার্লিন ও ব্রাসেলস সফরে বিভিন্ন কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনায় দুটি জরুরি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, ইউরোপকে দ্রুত তার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্জন করতে হবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
সাধারণ মত হলো, প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনে ইউরোপ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে। প্রতিযোগিতার ধার না ফেরাতে পারলে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ইউরোপ দুর্বল অবস্থানে থাকবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন মৌলিক গবেষণা ও উদ্ভাবনে এখনো এগিয়ে। কিন্তু গবেষণার সাফল্যকে বাজারজাত পণ্যে রূপ দিতে তাদের গতি অত্যন্ত ধীর।
অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ও বাজার বিভাজন
সমস্যার একটি বড় কারণ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন অনুযায়ী “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ” হিসেবে বিবেচিত কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা চালু করতে ছোট বা মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ থেকে ৫ লাখ ইউরো পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে শুধু অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের বিভাজন। ২৭টি সদস্য দেশের আইন, করব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক চর্চায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে ইউরোপীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিষ্ঠানের মতো দ্রুত সম্প্রসারণ করতে পারে না।
যদিও সমস্যার চিত্র নিয়ে মতভেদ কম, সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন। যে ডেমোক্রেটিক কাঠামো অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে, সেটিই আবার ২৭টি দেশকে একসঙ্গে বেঁধে রাখার ভিত্তি।
এক ইউরোপীয় গবেষকের ভাষায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন মূলত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। নিয়মভিত্তিক ও ঐকমত্যনির্ভর কাঠামোর মাধ্যমে একটি যৌথ ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় ফেরার পথ রোধ করাই ছিল লক্ষ্য। উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রতিযোগিতামূলক উদ্দীপনা জাগানো এর নকশার মূল উদ্দেশ্য ছিল না।

নিরাপত্তা নির্ভরতা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। অন্য শক্তির নিরাপত্তা ছাতার নিচে থেকে প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দাবি করা কঠিন।
পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় সামরিক ব্যয় ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ০ দশমিক ২ শতাংশ, যা চীনের চেয়েও কম এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় অনেক নিচে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
প্রাথমিক অনীহা সত্ত্বেও পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এখন অনেক ইউরোপীয়ই স্বীকার করছেন, প্রতিরক্ষায় বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এক কর্মকর্তা বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে সামরিক ব্যয় এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তাই বিষয়টি একেবারে অচেনা নয়। এতে অন্য খাতে কাটছাঁট করতে হবে, কিন্তু যেকোনো সমাজের জন্য নিরাপত্তা অগ্রাধিকার।
ভারী শিল্পের জন্য সুযোগ
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো ইউরোপের ভারী শিল্পের জন্যও সহায়ক হতে পারে। বেসামরিক খাতের তুলনায় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৈশ্বিকীকরণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত।

জার্মানির ঐতিহ্যবাহী থিসেনক্রুপ স্টিল, যা একসময় “রাইখের অস্ত্রাগার” নামে পরিচিত ক্রুপ স্টিলওয়ার্কসের উত্তরসূরি, গত ডিসেম্বর ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই করেছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনরুজ্জীবিত করা গেলে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার নতুন সুযোগ পেতে পারে।
কমান্ড কাঠামো ও ন্যাটো নির্ভরতা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের একসময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন বদলাচ্ছে। তবুও শিল্প সক্ষমতা পুনর্গঠন তুলনামূলক সহজ; কঠিন প্রশ্নটি হলো কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে ইউরোপ ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোর অধীনে পরিচালিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রাধান্যশীল।
ওয়াশিংটন ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ দিলেও ইউরোপকে ন্যাটো থেকে বেরিয়ে এসে পুরোপুরি স্বাধীন সামরিক শক্তি গড়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। ইউরোপের ভেতরেও এ বিষয়ে ঐকমত্য নেই। ফলে আপাতত ইউরোপ ন্যাটোকেই প্রধান প্রতিরক্ষা ছাতা হিসেবে ব্যবহার করবে।
সম্প্রতি ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক পদগুলো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যেখানে ইতালি, জার্মানি, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড দায়িত্ব পেয়েছে। আগে এসব পদে মার্কিন কমান্ডাররা ছিলেন। তবুও সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-126363856-59c67c1aaad52b0011324376.jpg)
পারমাণবিক নিরাপত্তার দোলাচল
সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হলো পারমাণবিক নিরাপত্তায় স্বাধীনতা। পাঁচ প্রধান পারমাণবিক শক্তির মধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইউরোপীয়। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কার্যত ফ্রান্সের দিকেই তাকিয়ে থাকতে পারে, যদি তারা ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।
ফ্রান্সের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় ছোট, এমনকি দ্রুত সম্প্রসারিত চীনের ভাণ্ডারের কাছেও পিছিয়ে। এতে ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাছাড়া ইতিহাসগত কারণে প্যারিস বা বার্লিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্বাধীনতার মূল্য দায়িত্ব। প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত বিশ্বে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে চাইলে ইউরোপকে ঠিক করতে হবে, সে কত দূর পর্যন্ত সেই মূল্য পরিশোধে প্রস্তুত।
চৌ চুং-ইয়ান 


















