কিউবার উপকূলে এক সামুদ্রিক ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, কিউবার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঘটনার তথ্য পাওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি খতিয়ে দেখা শুরু করে।
কিউবা উপকূলে ঘটনার তদন্ত
রুবিও জানান, কিউবার উপকূলে একটি ঘটনার বিষয়ে সে দেশের কর্তৃপক্ষ সকালে যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ, কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্তে নামে। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার বেশিরভাগই কিউবার পক্ষ থেকে সরবরাহ করা।
হাভানায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ঘটনাটি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করছে। সংশ্লিষ্ট নৌযানে যদি কোনো মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা থাকেন, তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। কিউবার দাবি, নৌযানটি ফ্লোরিডায় নিবন্ধিত ছিল—এই তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি স্পষ্ট করেন, পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনো অনুমান বা মন্তব্য করবে না। ঘটনার সব দিক স্বাধীনভাবে যাচাই করে তারপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সংশ্লিষ্টতা নেই
এক প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো অভিযান বা সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কোস্ট গার্ড পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় কিউবার সীমান্তরক্ষীরা প্রাথমিকভাবে তথ্য দেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও আনুষ্ঠানিক নোটের মাধ্যমে আরও বিস্তারিত জানানো হয়।
তবে কিউবার দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে না বলেও তিনি জানান। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উপায়ে তথ্য যাচাই করে তারপর নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করবে।
খোলা সমুদ্রে গোলাগুলি অস্বাভাবিক
রুবিও বলেন, খোলা সমুদ্রে এ ধরনের গোলাগুলির ঘটনা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং কিউবার সঙ্গে দীর্ঘদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রথমে জানতে হবে ঠিক কী ঘটেছে এবং কারা জড়িত ছিল। এরপরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে কেউ কেউ কিউবা থেকে লোকজন আনার চেষ্টা করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অবৈধ। তবে বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।

কিউবায় তেল বিক্রি ও অর্থনৈতিক সংকট
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ঘোষণার প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, কিউবার বেসরকারি খাতে জ্বালানি বিক্রি আগেও বৈধ ছিল। এটি কিউবা সরকারের কাছে নয়, বরং ক্ষুদ্র বেসরকারি খাতের কাছে যাবে। তবে এই খাত খুব ছোট এবং দেশের বড় অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়।
তিনি দাবি করেন, কিউবার বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দেশটির শাসনব্যবস্থাই দায়ী। ১৯৫৯ সালের পর থেকে ভর্তুকিনির্ভর অর্থনীতি, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, হুগো শাভেজের সহায়তা এবং পরে ভেনেজুয়েলার তেল—সব মিলিয়ে কিউবা দীর্ঘদিন বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে।
রুবিওর মতে, কিউবার বিদ্যুৎব্যবস্থা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মূল কারণ একটি অকার্যকর অর্থনৈতিক মডেল। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে কিউবার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ দেশ ছেড়েছে, যা সংকটের গভীরতা প্রমাণ করে।
মানবিক সহায়তা ও বেসরকারি খাত
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে ঘূর্ণিঝড়ের পর কিউবাকে মানবিক সহায়তা দিয়েছে, তবে সরকারকে নয়, চার্চের মাধ্যমে। জ্বালানি ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সীমিত সহায়তা দেওয়া হতে পারে। তবে এই সহায়তা অপব্যবহার হলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
ইরান ইস্যুতে কূটনৈতিক অগ্রাধিকার
ইরান প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুতর হুমকি। ইরান যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি চায়, তাহলে অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি আমদানি করে তা করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, ইরানের হাজার হাজার স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেন ও চীন প্রসঙ্গ
ভেনেজুয়েলা নিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও সাধারণ ক্ষমা আইনের মতো পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য নাগরিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উন্নত করতে হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রেসিডেন্টের ধৈর্য অসীম নয়, তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। মতপার্থক্য থাকলেও দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ চালিয়ে যাবে।
কিউবা উপকূলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনভাবে তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সঙ্গে কিউবার অর্থনৈতিক সংকট, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















