পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের পশ্চিম প্রান্তে একটি অস্ত্রভাণ্ডার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রাতভর চলা বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হামলার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে অস্ত্রভাণ্ডারে রাখা গোলাবারুদে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কাবুলের বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর কেঁপে ওঠে, জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং বহু মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে নিচে নেমে আসেন।
দারুলামান এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী
রয়টার্সের যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, কাবুলের পশ্চিমাঞ্চলের দারুলামান আবাসিক এলাকায় ঘন কালো ধোঁয়া আকাশে উড়ছে। ওই এলাকায় কয়েকটি সরকারি ও সামরিক স্থাপনাও রয়েছে। অস্ত্রভাণ্ডারের একটি অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং গোলাবারুদে আগুন লাগার কারণে বারবার বিস্ফোরণে রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মধ্যরাতের কিছু পরেই বোমাবর্ষণ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা: “সবাই আতঙ্কে নিচে নেমে আসে”
অস্ত্রভাণ্ডারের কাছে বসবাসকারী ট্যাক্সিচালক তামিম বলেন, তারা ঘুমিয়ে ছিলেন, হঠাৎ বিমানের শব্দ শুনতে পান। বিমানটি এসে দুটি বোমা ফেলে চলে যায়। এরপরই একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভেতরে রাখা গোলাবারুদে আগুন ধরে গেলে নিজে থেকেই বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। এতে পুরো পরিবার আতঙ্কে দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে নেমে আসে।
তিনি জানান, আগুন ভোর ছয়টা পর্যন্ত জ্বলেছে। পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তাদের কেউ আহত না হলেও বিস্ফোরণের তীব্রতায় দরজা-জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কাচ ভেঙে গেছে।

আরেক বাসিন্দা, ৩৫ বছর বয়সী ফার্মাসিস্ট দানিশ জানান, সীমান্ত উত্তেজনার খবর শুনে তিনি আগেই জেগে ছিলেন। বিস্ফোরণের শব্দে সারারাত আর ঘুমাতে পারেননি।
শহরের অন্য এলাকাতেও বিস্ফোরণের শব্দ ও আকাশে উড়োজাহাজের আওয়াজ শোনা যায়। পরে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
৩১ বছর বয়সী মোবাইল বৈদ্যুতিক সামগ্রী বিক্রেতা মোহাম্মদ আলি জানান, রাত দুইটার দিকে একটি বিস্ফোরণে তারা চমকে ওঠেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন ভূমিকম্প হয়েছে, পরে বুঝতে পারেন এটি গোলাগুলি।
তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের চেয়ে জীবিকা ও দারিদ্র্য নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা বেশি।”
পাকিস্তান-আফগান উত্তেজনা তীব্র

এই হামলাকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলমান উত্তেজনার বড় ধরনের বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই পক্ষই সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান পরিস্থিতিকে কার্যত ‘খোলা সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দুই দেশই দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে তারা প্রতিপক্ষের বহু যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। কয়েক মাস ধরে জঙ্গি হামলা বৃদ্ধি, একে অপরকে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এবং সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনার পর এই সংঘাত আরও তীব্র আকার নেয়।
সংকটের ভেতর নতুন শঙ্কা
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় আফগানিস্তানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাবুলের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী ইয়ালদা বিস্ফোরণের খবর শুনে দারুলামানে বোনের খোঁজ নিতে যান। তিনি বলেন, “আজ এখানে হামলা হলে কাল আমাদের এলাকাও লক্ষ্য হতে পারে। দুর্ভোগ আবার শুরু হলো।”
রাজধানীর বহু বাসিন্দার কাছে এই হামলা অতীতের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















