ভিয়েতনামের বাণিজ্যিক রাজধানী হো চি মিন শহর ধাপে ধাপে পেট্রোল চালিত যান নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে। শহরের কেন্দ্রভাগকে কম নির্গমন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বিদ্যুৎচালিত যান ব্যবহারে অভ্যস্ত করা এবং ক্রমবর্ধমান বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা।
নির্দিষ্ট সময়ে পেট্রোল চালিত যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা
শহর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নির্ধারিত কম নির্গমন এলাকায় ব্যস্ত সময়ে পেট্রোল চালিত যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণের কান জিও জেলায় এই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে, পরে শহরের কেন্দ্রে তা বিস্তৃত করার কথা রয়েছে।
সরকারি কর্মী ও রাইড সেবায় শতভাগ বিদ্যুৎ চালিত মোটরবাইক
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য মতে, ২০২৭ সালের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা ও রাইড সেবায় ব্যবহৃত মোটর বাইকের অন্তত অর্ধেক বিদ্যুৎচালিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতে শতভাগ বিদ্যুৎচালিত মোটরবাইক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নজরদারি ও অবকাঠামো উন্নয়ন
কম নির্গমন এলাকায় অবৈধভাবে প্রবেশ করা যান শনাক্তে রাস্তার ক্যামেরা ব্যবহার করে জরিমানা আরোপ করা হবে। একই সঙ্গে শহরজুড়ে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে বড় পরিসরে কাজ শুরু হয়েছে। শপিং মলসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পাশাপাশি অফিস, হাসপাতাল, পার্কিং এলাকায় বাসস্টেশনে চার্জিং সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বায়ু দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি
ভিয়েতনামে প্রায় আশি শতাংশ মানুষের ব্যক্তিগত মোটরবাইক রয়েছে, যার অধিকাংশই পেট্রোলচালিত। এই বাস্তবতায় পেট্রোল সীমিত করার সিদ্ধান্ত সহজ নয়। তবে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক জরিপে রাজধানী হ্যানয়কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর হো চি মিনও দূষণের তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দূষণজনিত শ্বাসকষ্টে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আবাসিক ভবনে নিষেধাজ্ঞার দ্বন্দ্ব
যদিও নীতিগতভাবে বিদ্যুৎ চালিত যানকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে কিছু আবাসিক ভবন আগুনের ঝুঁকির আশঙ্কায় বিদ্যুৎ চালিত মোটরবাইক ও গাড়ি প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেট্রোল চালিত যানের তুলনায় এসব যান কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এই ভয় দূর হয়নি। ফলে অনেক মানুষ দ্বৈত নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন।
চার্জিং নেটওয়ার্ক ও বাজারের প্রতিযোগিতা
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও চার্জিং সুবিধা বাড়াচ্ছে। কফিশপ থেকে শুরু করে বড় নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় বাজারে একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে কিছু আন্তর্জাতিক নির্মাতা চার্জিং সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা জানিয়েছে।
আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনা
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্বল্প আয়ের দশ হাজার চালককে মোটরবাইক কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের সুযোগ, কম সুদের হার, কর ও নিবন্ধন ফি ছাড় সহ বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ চালিত যানে রূপান্তর সহজ করতে চায় শহর কর্তৃপক্ষ। হিসাব অনুযায়ী, এতে জ্বালানি খরচে মাসে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব।
এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, বরং মানুষের মানসিকতা ও দৈনন্দিন অভ্যাস বদলানোর এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















