ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক যখন নানা জটিলতায় নতুন করে চাপে, ঠিক তখনই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তার মন্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক উত্তাপ ছড়াল। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় গত বছর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ভারত সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া
সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আলোচনার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, একাধিক দফা আলোচনায় দুই দেশই কয়েকবার চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। এসব আলোচনা হয়েছিল গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকে গৃহীত প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই।
জয়সওয়াল আরও বলেন, ভারত এখনো পারস্পরিকভাবে লাভজনক একটি বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী এবং তা চূড়ান্ত করার দিকেই তাকিয়ে আছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতির অভিযোগও ঠিক নয়, কারণ ২০২৫ সালেই মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে আটবার ফোনালাপ হয়েছে, যেখানে বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে।
ফোন কূটনীতির দাবি ও ভারতের অবস্থান
এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে লুটনিক দাবি করেন, ভারতকে তিনটি শুক্রবার সময় দেওয়া হয়েছিল এবং চুক্তি চূড়ান্ত করতে মোদিকেই ট্রাম্পকে ফোন করতে হতো। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, ভারতীয় পক্ষ নাকি এই ফোনালাপ নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল।
তবে বিষয়টি জানেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, একটিমাত্র ফোনালাপে পুরো চুক্তি সইয়ের মতো পর্যায়ে আলোচনা পৌঁছেছিল—এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। বরং আলোচনায় অগ্রগতি হলেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন নতুন দাবি আসত। বিশেষ করে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধ খাত খুলে দেওয়ার চাপ ছিল প্রধান ইস্যু, যেখানে ভারত সরকার আগেই নিজের লাল দাগ স্পষ্ট করে দিয়েছিল। অনেকের মতে, লুটনিকের সাম্প্রতিক মন্তব্য আসলে আলোচনায় চাপ তৈরির কৌশল।
চুক্তি কেন ঝুলে আছে
২০২৫ সালে একাধিক দফা আলোচনা ও উচ্চপর্যায়ের সফরের পরও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উপ-বাণিজ্য প্রতিনিধি রিক সুইজারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতে আসে। চুক্তি না হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক এখনো বহাল রয়েছে, যার মধ্যে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্কও রয়েছে।
রাশিয়ার তেল ও নতুন নিষেধাজ্ঞা উদ্বেগ
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের প্রস্তাবিত রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিল নিয়েও ভারতের নজর রয়েছে। ওই বিলে রাশিয়ার তেল কেনা দেশগুলোর ওপর কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। জয়সওয়াল এ বিষয়ে বলেন, ভারতের জ্বালানি নীতি পরিষ্কার। বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবং একশো চল্লিশ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিলও মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল। কারণ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল নিজেই নিষিদ্ধ পণ্য নয় এবং ভারতের বেসরকারি শোধনাগারগুলো বাজার পরিস্থিতি দেখে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
বহুপাক্ষিকতায় ভারতের বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও উঠে আসে ব্রিফিংয়ে। আন্তর্জাতিক সৌর জোট প্রসঙ্গে জয়সওয়াল বলেন, ভারত বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী। বিশ্বের বড় সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব সম্মিলিত ও পরামর্শভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমেই। আন্তর্জাতিক সৌর জোট তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং ভারত ভবিষ্যতেও এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















