মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে ইরানের হামলায় ইরাকের জলসীমায় দুটি তেলবাহী জাহাজে আগুন লেগেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বলে দাবি করলেও বাস্তবে সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ নেই। তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি দামের চাপ আবারও বাড়ছে।
ইরাকের কাছে তেলবাহী জাহাজে আগুন
ইরানের বিস্ফোরকভর্তি নৌযানের আঘাতে ইরাকের জলসীমায় দুটি তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়। নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় জলপথে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে অন্তত একজন নাবিক নিহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক কৌশলগত তেলের মজুত থেকে বড় পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণার পরই এই হামলা চালিয়েছে ইরান। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দুই হাজারের বেশি প্রাণহানি, শিশুদের বড় ক্ষতি
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাত শুরু হয়। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হামলা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল জানিয়েছে, নিহত ও আহতদের মধ্যে এক হাজার একশর বেশি শিশু রয়েছে। ফলে মানবিক সংকট দ্রুত গভীর হচ্ছে।
তেলের দাম দুইশ ডলারে পৌঁছানোর হুঁশিয়ারি
ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির হওয়ায় বিশ্বকে ব্যারেলপ্রতি দুইশ ডলার দামের তেলের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সপ্তাহের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় একশ বিশ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে তা কিছুটা কমে প্রায় নব্বই ডলারে নেমে এলেও নতুন হামলার খবরের পর আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে।
বিশ্বের শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ার সূচকগুলো নেমে গেছে এবং এশিয়ার বাজারেও পতনের প্রবণতা দেখা গেছে।

ট্রাম্পের দাবি, যুদ্ধ প্রায় শেষ
কেন্টাকিতে এক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয় পেয়েছে। তিনি বলেন, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা থামবে না।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের বহু নৌযান ধ্বংস করেছে এবং পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উত্তেজনা
বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
ইরান জানিয়েছে, প্রণালিটি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট সেখানে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে যৌথ পাহারার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
খবরে বলা হয়েছে, প্রণালির ভেতরে ইরান প্রায় এক ডজন নৌমাইন পেতে রেখেছে। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
কৌশলগত তেলের মজুত ছাড়ার পরিকল্পনা
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার সুপারিশ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চারশ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হস্তক্ষেপ হতে পারে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব কৌশলগত মজুত থেকে প্রায় একশ বাহাত্তর মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছে।

হামলার ঝুঁকি ছড়াচ্ছে পুরো অঞ্চলে
ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোও হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে ইরাকের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিদেশি স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত একটি বড় আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















