প্রধান রায় ও প্রেক্ষাপট
মুসলিম পারিবারিক আইনে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক নয়—এমন বিধান বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য স্ত্রীর সম্মতি নয়, সালিশি পরিষদের পূর্বানুমতি প্রয়োজন। আগস্টে দেওয়া এই রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ ওই রিট আবেদন খারিজ করেন, যেখানে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছিল।
রায়ের ফলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৬ বহাল থাকছে। এই ধারায় বিদ্যমান বিয়ে থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করতে হলে সালিশি পরিষদের পূর্বানুমতি নেওয়ার কথা বলা আছে।
আইনের বর্তমান অবস্থান

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে একসময় স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান ছিল। পরে ১৯৬১ সালে জারি হওয়া মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হয়।
এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিদ্যমান বিয়ে থাকা অবস্থায় সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া নতুন বিয়ে করা যাবে না এবং এমন বিয়ে নিবন্ধনযোগ্যও নয়। অনুমতির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হয়। আবেদনে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ ও প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করতে হয় এবং বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও জানাতে হয়।
সালিশি পরিষদ উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে অনুমতি দিতে বা না দিতে পারে এবং সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হয়। অনুমতি না পেলে যে কোনো পক্ষ সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারে, যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের পূর্ণ দেনমোহর তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হতে পারে এবং সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট রায়ে ইসলামি আইন ও সংবিধানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে। কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত বলেন, ইসলাম বহুবিবাহের অনুমতি দিলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে একাধিক বিয়ে থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দিয়েছে।

আদালত উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে প্রযোজ্য হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বহুবিবাহ শর্তসাপেক্ষে বৈধ, তবে ন্যায়বিচার ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা আবশ্যক। আদালতের সারসংক্ষেপে বলা হয়, ইসলাম বহুবিবাহ অনুমোদন করলেও তা কঠোর শর্তের অধীন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে একাধিক বিয়ে না করাই উত্তম।
বেঞ্চ ১৯৯৭ সালের একটি রায়ের কথাও উল্লেখ করে, যেখানে ধারা ৬ বাতিল করে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল এবং তিউনিসিয়া ও তুরস্কের উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি বলে আদালত উল্লেখ করেন।
বিচারপতিরা বলেন, সরকার যদি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বহুবিবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য কোনো কাঠামো গড়ে তোলে, তাহলে এ সংক্রান্ত বহু বিতর্কের অবসান হতে পারে।
সংবিধানিক চ্যালেঞ্জ খারিজ
আদালত রায়ে বলেন, ধারা ৬ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া বৈষম্যমূলক বা খামখেয়ালি নয়। এটি নারী বা পুরুষের অধিকার খর্ব করে না এবং সালিশি পরিষদের ওপরও কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। আদালত আরও বলেন, এই বিধান সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতার নীতির পরিপন্থী নয়; বরং আইনের অধীন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ৪১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হাইকোর্ট ঘোষণা করেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৬ নারী নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না এবং রিট আবেদন খারিজ করা হয়।
আবেদনকারীর বক্তব্য
রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো—দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক। বাস্তবে আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; অনুমতির ক্ষমতা সালিশি পরিষদের হাতেই ন্যস্ত।
তিনি বলেন, সালিশি পরিষদ কোন মানদণ্ডে অনুমতি দেবে বা দেবে না—সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই, ফলে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই কারণেই তিনি স্ত্রীর সম্মতি বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলে রিট করেছিলেন। হাইকোর্ট সেই আবেদন খারিজ করেছে এবং তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















