ফিলিপাইনের সেবু শহরে বিশাল আবর্জনার পাহাড় ধসে পড়ার তিন দিন পর জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। রবিবার ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও একটি মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত উনত্রিশ জন। দুর্ঘটনার পর থেকে যে বাহাত্তর ঘণ্টাকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়, সেই সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে।
ধসের ভয়াবহতা ও উদ্ধার তৎপরতা
গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বিনালিউ ল্যান্ডফিলে কাজ করার সময় প্রায় পঞ্চাশজন স্যানিটেশন কর্মীর ওপর হঠাৎ ধসে পড়ে বিশাল আবর্জনার স্তূপ। স্থানীয়দের ভাষায়, প্রায় বিশ তলা ভবনের সমান উচ্চতা থেকে নেমে আসে এই ময়লার পাহাড়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যান শ্রমিকরা। উদ্ধারকর্মীরা টনকে টন বর্জ্যের ভেতর খুঁড়ে খুঁড়ে নিখোঁজদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
জীবনের চিহ্ন মিললেও ক্ষীণ আশা
রবিবার স্থানীয় দমকল কর্মকর্তা ওয়েন্ডেল ভিলানুয়েভা জানান, বিশেষ রাডার ব্যবহার করে একদিন আগে ধ্বংসস্তূপের প্রায় ত্রিশ মিটার নিচে দুটি হৃদস্পন্দনের সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ অবস্থায় আর কোনো জীবনের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, এত ভারী আবর্জনা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে তিন দিন পরও কারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। এখন পর্যন্ত বারোজন কর্মীকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বৃষ্টি ও নতুন ধসের শঙ্কা
উদ্ধারকাজ চলাকালীন আরেক দফা ধসের ঝুঁকিও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার উদ্ধার কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, এখনও নড়াচড়া করা আবর্জনার পাহাড় যে কোনো সময় আবার ভেঙে পড়তে পারে। টানা বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। ঝুঁকির কারণে মাঝেমধ্যে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতেও হয়েছে।
উদ্ধার থেকে মরদেহ উদ্ধারে মনোযোগ
রবিবার এক ফোনালাপে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সোমবার থেকে উদ্ধার তৎপরতার লক্ষ্য ধীরে ধীরে জীবিত উদ্ধার থেকে মরদেহ উদ্ধারের দিকে মোড় নিতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি দল। ইতোমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক তথ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় মরদেহ উদ্ধারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারগুলোর অপেক্ষা ও হাহাকার
দুর্ঘটনাস্থলের বাইরে রোদ থেকে বাঁচতে অস্থায়ী তাবুর নিচে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন নিখোঁজদের স্বজনরা। কেউ কেউ আবার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিখোঁজ এক শ্রমিকের বোন জেজিল মাতাবিদ বলেন, তাদের একটাই চাওয়া—ভাইকে খুঁজে পাওয়া, জীবিত হোক বা মৃত। যেন অন্তত সম্মানের সঙ্গে শেষকৃত্য করা যায়।

আরেক নারী জানান, তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাঁর বড় বোনের কোনো খবর না পাওয়ায় পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। অনিশ্চয়তার এই অপেক্ষা তাঁদের পাগল করে দিচ্ছে বলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন।
নিরাপত্তা ঘিরে প্রশ্ন
নিখোঁজ আরেক শ্রমিকের ভাই এলমার আগুইলার জানান, তিনি আরও দশজনকে নিয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তা করতে এসেছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
সিটি কাউন্সিলের সদস্য জোয়েল গারগানেরা বলেন, যে উচ্চতা থেকে আবর্জনা নেমে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, বৃষ্টি হলেই শহরের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটে, আর পানিশোষণকারী আবর্জনার পাহাড় হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাঁর ভাষায়, এটি অনিবার্য দুর্ঘটনা ছিল। তিনি আরও বলেন, এই ল্যান্ডফিলই সেবু ও আশপাশের এলাকার একমাত্র বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হওয়ায় শহরের জন্য এটি দ্বিগুণ সংকট তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















