২০২৫ সালের ঐতিহাসিক উত্থানের পর ২০২৬ সালে সোনার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার বদলে সীমিত পরিসরে ওঠানামার ইঙ্গিত মিলছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারে ধীরে কমার সম্ভাবনা এবং ডলারের তুলনামূলক শক্ত অবস্থান—এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে নতুন বছরে সোনার দাম মূলত একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই ঘোরাফেরা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ব সোনার বাজারে নজর রাখা সংস্থা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল মনে করছে, বাজার যদি বর্তমান ধারাতেই চলে, তাহলে বড় উল্লম্ফনের বদলে স্থিতাবস্থাই বেশি সম্ভাব্য। তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হোঁচট খেলে এবং নীতিনির্ধারকরা আরও শিথিল অবস্থান নিলে সোনার দাম পাঁচ থেকে পনের শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর যদি একই সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক মন্দা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়, সে ক্ষেত্রে দাম পনের থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত লাফ দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
২০২৫ সালের রেকর্ড উত্থানের প্রভাব
গত বছর সোনার বাজার ছিল নজিরবিহীন। এক বছরে তিপ্পান্নবার সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে পৌঁছায় সোনা এবং বছরের শেষে প্রতি আউন্সের দাম দাঁড়ায় চার হাজার তিন শত আটষট্টি ডলারে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে দাম সাময়িকভাবে আরও ওপরে উঠে চার হাজার চার শত ঊনপঞ্চাশ ডলারে পৌঁছেছিল। পুরো বছরে মার্কিন মুদ্রায় হিসাব করলে সোনার দাম বেড়েছে প্রায় সাতষট্টি শতাংশ, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
এই উত্থানের পেছনে ছিল ডলারের দুর্বলতা, সুদের হার কমার প্রবণতা, বিকল্প বিনিয়োগে বাড়তি আগ্রহ এবং বিশ্বজুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার বিপরীতে ডলার দুর্বল হওয়ায় সোনার প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়েছে।
রূপা ও প্লাটিনামের সঙ্গে তুলনা
ডিসেম্বর মাসে মূল্যবান ধাতুগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেলেও সোনার আচরণ ছিল তুলনামূলক স্থির। রূপা ও প্লাটিনামে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব দ্রুত পড়লেও সোনার বাজারে তারল্য বেশি থাকায় অস্থিরতা তুলনামূলক কম ছিল। এমনকি যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মার্জিন বাড়ানো হয়, তখন অন্য ধাতুর দামে বড় ঝাঁকুনি লাগলেও সোনার দামের পরিসর ছিল সীমিত।
বিনিয়োগ প্রবাহ ও নিরাপদ আশ্রয়
২০২৫ সালের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ স্পষ্টভাবে সোনার দিকে ঝুঁকেছে। উত্তর আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বজুড়ে সোনাভিত্তিক তহবিলে টানা সাত মাস ধরে বিনিয়োগ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার গুরুত্ব আরও জোরালো হয়েছে। কাউন্সিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সূচক একশ পয়েন্ট বাড়লে স্বল্পমেয়াদে সোনার দাম গড়ে প্রায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ
নতুন বছরে সোনার বাজারে কিছু স্বল্পমেয়াদি চাপ আসতে পারে। অন্যান্য ধাতুর অস্থিরতার প্রভাব, পণ্য সূচকের পুনর্বিন্যাস এবং দাম বাড়লে পুনর্ব্যবহার সামান্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াতে বা কমাতে পারে। এই সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক, সামগ্রিকভাবে নীতিগত ঝুঁকি সোনার পক্ষে সহায়কই হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
টানা তিপ্পান্নটি রেকর্ড ও শক্তিশালী উত্থানের পরও সোনার মৌলিক শক্তি এখনো অটুট। নীতিগত অনিশ্চয়তা, ভূ রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ মিলিয়ে ২০২৬ সালে বড় চমক এলে তার লাভবান হতে পারে সোনাই। বাজার স্থির থাকলে দাম সীমিত পরিসরে থাকবে, আর অপ্রত্যাশিত ঝাঁকুনি এলে সোনা আবারও নিরাপদ ভরসা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















