০৮:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬
ছোট লিফট নাকি নিরাপদ লিফট? যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্কে প্রতিবন্ধী মানুষের উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ঘিরে ধোঁয়াশা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলায় বাড়ল বৈশ্বিক জ্বালানি উদ্বেগ অপরাধ দমনের ক্যামেরাই হয়ে উঠছে নজরদারির অস্ত্র! ব্যক্তিগত জীবনে পুলিশের অপব্যবহার নিয়ে তীব্র উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা আরও সহজ, দুই লাখ ডলার আয় পর্যন্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি মওকুফ বিরামপুরে ইউএনও কার্যালয়ে পুলিশ সদস্যকে লাথি, বিএনপি নেতার ছেলেসহ ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা রাজধানীতে সিএনজি সংকট: পাম্পে গ্যাসের চাপ কমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে চালকরা, দুর্ভোগে যাত্রীরা চা খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে বগুড়ায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকে পিটিয়ে হত্যা সব বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নতুন কমিটি, আন্তর্জাতিক মানে উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: মাঠে হেলমেট ও পাইপ হাতে যুবদল নেতা নয়ন, উত্তপ্ত রাজধানীর শিক্ষাঙ্গন সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব: ‘জাতির পিতা’ স্বীকৃতি বাদ, ফিরতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার

পারমাণবিক ধ্বংসস্তূপ থেকে মানবতার আশ্রয়

হিরোশিমার পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিভীষিকা থেকে জন্ম নেওয়া এক মানবিক আশ্রয় আজও শিশুদের জীবনের দিশা দেখাচ্ছে। জাপানের হিগাশি হিরোশিমায় অবস্থিত হিরোশিমা শিনসেই গাকুয়েন ২০২৫ সালে পেরিয়েছে প্রতিষ্ঠার আশি বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব শিশু অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল, তাদের জন্য যে আশ্রম গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে নির্যাতন ও পারিবারিক সংকটে থাকা শিশুদের নির্ভরতার ঠিকানা।

পারমাণবিক অভিজ্ঞতা থেকে আশ্রমের জন্ম

এই প্রতিষ্ঠানের শিকড় গেঁথে আছে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের এক ভয়াল অভিজ্ঞতায়। প্রতিষ্ঠাতা ইয়োরিতো কামিকুরি তখন জাপানি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা। পারিবারিক ছুটিতে থাকা অবস্থায় হিরোশিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণের মুখোমুখি হন তিনি। বিস্ফোরণের পর শহরের দিকে ছুটে গিয়ে ইয়োকোগাওয়া সেতুর কাছে মৃত মায়ের বুকে দুধ খাওয়া এক শিশুকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যান। শিশুটিকে পানি দিয়ে চলে এলেও সেই দৃশ্য আজীবন তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। সেদিন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বেঁচে থাকলে এমন অনাথ শিশুদের জীবন বাঁচাতে নিজেকে উৎসর্গ করবেন।

যুদ্ধোত্তর অনাথদের সেবা

যুদ্ধের পর হিরোশিমার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া অনাথ শিশুদের সহায়তা দিয়ে তাঁর কাজ শুরু। পরে নিজ অর্থে উজিনা এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তখন অনেক শিশু মারাত্মক অপুষ্টি ও অসুখে ভুগছিল, কেউ কেউ নিজের নামও বলতে পারত না। কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানে দুই শতাধিক শিশু আশ্রয় পায়, যাদের মধ্যে অনেকে বেঁচে থাকতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে আশ্রম স্থানান্তরিত হয়ে আজকের হিগাশিহিরোশিমায় সামাজিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।

 

 

 

স্মৃতি আর শিক্ষার মেলবন্ধন

প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আজও রক্ষিত রয়েছে দাবিহীন দশ অনাথ শিশুর ভস্ম। তার ওপর নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি সেই মা ও শিশুর স্মৃতিতে, যাদের একদিন বাঁচাতে পারেননি প্রতিষ্ঠাতা। প্রতি বছর ৬ আগস্ট শিশুদের সামনে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শান্তির মূল্য তুলে ধরেন বর্তমান পরিচালক তেতসুও কামিকুরি। তাঁর কথায়, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস বলা মানেই হিরোশিমার গল্প নতুন প্রজন্মকে শোনানো।

খেলাধুলায় শৃঙ্খলা ও আত্মনির্ভরতা

হিগাশি হিরোশিমায় আসার পর আশ্রমে খেলাধুলা ভিত্তিক দলগত শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পায়। বেসবল ও সফটবল মাঠ তৈরি করে শিশুদের মধ্যে ঐক্য, সহনশীলতা আর পরিশ্রমের মানসিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। তেতসুও কামিকুরির বিশ্বাস, পরিবার ছাড়া বড় হওয়া শিশুদের সমাজে টিকে থাকতে শিষ্টাচার ও ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার জরুরি, আর খেলাধুলাই তা শেখার পথ।

সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক

শুরুর দিকে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলেও আশ্রম ধীরে ধীরে সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। কৃষক ও রাতের শিফটে কাজ করা নার্সদের শিশুদের জন্য দিনরাত খোলা শিশু যত্নকেন্দ্র চালু করা হয়। মাঠ স্থানীয় ক্রীড়া দলগুলোর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় বিনা খরচে। যদিও এখন সেই কেন্দ্রটি বন্ধ, তবু এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার তিনশ শিশুর জীবন ছুঁয়ে গেছে এই প্রতিষ্ঠান।

ইতিহাস বহনের দায়

প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করছেন আয়াকো হোসোকাওয়া। তিনি বলেন, এটি কেবল অতীতের গল্প নয়। শিশুদের প্রতি আন্তরিকতা ও গভীর দায়বদ্ধতার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, সেটিই আজকের সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ছোট লিফট নাকি নিরাপদ লিফট? যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিতর্কে প্রতিবন্ধী মানুষের উদ্বেগ

পারমাণবিক ধ্বংসস্তূপ থেকে মানবতার আশ্রয়

০৪:১৫:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

হিরোশিমার পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিভীষিকা থেকে জন্ম নেওয়া এক মানবিক আশ্রয় আজও শিশুদের জীবনের দিশা দেখাচ্ছে। জাপানের হিগাশি হিরোশিমায় অবস্থিত হিরোশিমা শিনসেই গাকুয়েন ২০২৫ সালে পেরিয়েছে প্রতিষ্ঠার আশি বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব শিশু অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছিল, তাদের জন্য যে আশ্রম গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে নির্যাতন ও পারিবারিক সংকটে থাকা শিশুদের নির্ভরতার ঠিকানা।

পারমাণবিক অভিজ্ঞতা থেকে আশ্রমের জন্ম

এই প্রতিষ্ঠানের শিকড় গেঁথে আছে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্টের এক ভয়াল অভিজ্ঞতায়। প্রতিষ্ঠাতা ইয়োরিতো কামিকুরি তখন জাপানি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা। পারিবারিক ছুটিতে থাকা অবস্থায় হিরোশিমায় পারমাণবিক বিস্ফোরণের মুখোমুখি হন তিনি। বিস্ফোরণের পর শহরের দিকে ছুটে গিয়ে ইয়োকোগাওয়া সেতুর কাছে মৃত মায়ের বুকে দুধ খাওয়া এক শিশুকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যান। শিশুটিকে পানি দিয়ে চলে এলেও সেই দৃশ্য আজীবন তাঁকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। সেদিন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, বেঁচে থাকলে এমন অনাথ শিশুদের জীবন বাঁচাতে নিজেকে উৎসর্গ করবেন।

যুদ্ধোত্তর অনাথদের সেবা

যুদ্ধের পর হিরোশিমার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া অনাথ শিশুদের সহায়তা দিয়ে তাঁর কাজ শুরু। পরে নিজ অর্থে উজিনা এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তখন অনেক শিশু মারাত্মক অপুষ্টি ও অসুখে ভুগছিল, কেউ কেউ নিজের নামও বলতে পারত না। কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানে দুই শতাধিক শিশু আশ্রয় পায়, যাদের মধ্যে অনেকে বেঁচে থাকতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে আশ্রম স্থানান্তরিত হয়ে আজকের হিগাশিহিরোশিমায় সামাজিক কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।

 

 

 

স্মৃতি আর শিক্ষার মেলবন্ধন

প্রতিষ্ঠানের ভেতরে আজও রক্ষিত রয়েছে দাবিহীন দশ অনাথ শিশুর ভস্ম। তার ওপর নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি সেই মা ও শিশুর স্মৃতিতে, যাদের একদিন বাঁচাতে পারেননি প্রতিষ্ঠাতা। প্রতি বছর ৬ আগস্ট শিশুদের সামনে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শান্তির মূল্য তুলে ধরেন বর্তমান পরিচালক তেতসুও কামিকুরি। তাঁর কথায়, প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস বলা মানেই হিরোশিমার গল্প নতুন প্রজন্মকে শোনানো।

খেলাধুলায় শৃঙ্খলা ও আত্মনির্ভরতা

হিগাশি হিরোশিমায় আসার পর আশ্রমে খেলাধুলা ভিত্তিক দলগত শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পায়। বেসবল ও সফটবল মাঠ তৈরি করে শিশুদের মধ্যে ঐক্য, সহনশীলতা আর পরিশ্রমের মানসিকতা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়। তেতসুও কামিকুরির বিশ্বাস, পরিবার ছাড়া বড় হওয়া শিশুদের সমাজে টিকে থাকতে শিষ্টাচার ও ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার জরুরি, আর খেলাধুলাই তা শেখার পথ।

সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক

শুরুর দিকে স্থানীয়দের আপত্তি থাকলেও আশ্রম ধীরে ধীরে সমাজের অংশ হয়ে ওঠে। কৃষক ও রাতের শিফটে কাজ করা নার্সদের শিশুদের জন্য দিনরাত খোলা শিশু যত্নকেন্দ্র চালু করা হয়। মাঠ স্থানীয় ক্রীড়া দলগুলোর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় বিনা খরচে। যদিও এখন সেই কেন্দ্রটি বন্ধ, তবু এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার তিনশ শিশুর জীবন ছুঁয়ে গেছে এই প্রতিষ্ঠান।

ইতিহাস বহনের দায়

প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করছেন আয়াকো হোসোকাওয়া। তিনি বলেন, এটি কেবল অতীতের গল্প নয়। শিশুদের প্রতি আন্তরিকতা ও গভীর দায়বদ্ধতার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, সেটিই আজকের সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজন।