ইরানে দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ এখনো খোলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ইসলামি বিপ্লবের পর চার দশকের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও শুল্ক ঘোষণা
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পঁচিশ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করবে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তবে কোন আইনি কাঠামোয় এই শুল্ক কার্যকর হবে কিংবা সব বাণিজ্য অংশীদারের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। হোয়াইট হাউস থেকেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য আসেনি।

বিক্ষোভ ও মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র
অর্থনৈতিক সংকট, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও দৈনন্দিন দুর্ভোগ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরাসরি ধর্মীয় শাসনের পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী একটি সংগঠনের হিসাবে এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই বিক্ষোভকারী হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও পথচারীরাও রয়েছেন। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়েছেন দশ হাজারের বেশি মানুষ।
তেহরানের বেহেশতে জাহরা কবরস্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কবরের পাশে জড়ো হয়ে প্রতিবাদী স্লোগান দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে ওই সংগঠন। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কূটনীতি বনাম সামরিক বিকল্প
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক হামলাসহ নানা বিকল্প ট্রাম্পের সামনে থাকলেও কূটনীতিই এখনো তাঁর প্রথম পছন্দ। তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রকাশ্যে ইরানের বক্তব্যের সঙ্গে গোপনে পাঠানো বার্তার মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে এবং সেসব বার্তা খতিয়ে দেখতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের প্রস্তাবগুলো তারা পর্যালোচনা করছেন, যদিও সেগুলোর সঙ্গে হুমকির অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁর দাবি, বিক্ষোভের আগে ও পরেও দুই পক্ষের যোগাযোগ অব্যাহত আছে।
নিরাপত্তা সতর্কতা ও অভ্যন্তরীণ অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ইরানে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তার ও আটক হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। প্রয়োজনে স্থলপথে প্রতিবেশী দেশে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ইরান সরকার অবশ্য সহিংসতার জন্য বিদেশি হস্তক্ষেপ ও সন্ত্রাসীদের দায়ী করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীর নিহতদের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ ইন্টারনেট বন্ধের কারণে তথ্যপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যদিও কিছু মানুষ বিকল্প উপায়ে সংযোগ পাচ্ছেন।

অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও আঞ্চলিক প্রভাব
এত বড় বিক্ষোভের পরও এখন পর্যন্ত ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে ভাঙনের লক্ষণ দেখা যায়নি। বিক্ষোভকারীদেরও কোনো সুস্পষ্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। সংসদের স্পিকার এক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চারমুখী যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তবে বৈঠকের আগেই পরিস্থিতি আরও জটিল হলে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এর মধ্যে সাইবার হামলা, সামরিক আঘাত কিংবা আরও নিষেধাজ্ঞার কথাও আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তেলের বাজারে প্রতিক্রিয়া
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রপ্তানি ব্যাহত হলে বাজারে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















