যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরের সংস্কার ব্যয়ের তথ্য নিয়ে দেওয়া সাক্ষ্য ঘিরে এই তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে পাওয়েলের পদত্যাগ দাবি করেছেন। যদিও হোয়াইট হাউস বলছে, তদন্তের নির্দেশ সরাসরি প্রেসিডেন্ট দেননি।
এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের চাপের সবচেয়ে বড় ধাপ হিসেবে। তাঁর অভিযোগ, সুদের হার যথেষ্ট দ্রুত কমানো হচ্ছে না, যার ফলে অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে। সরকারি কর্মচারী ছাঁটাই, অভ্যন্তরীণ তদারকি কাঠামো দুর্বল করা এবং স্বাধীন সংস্থায় নিযুক্ত বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অপসারণের ধারাবাহিকতায় এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সরাসরি চাপের মুখে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্পের নীতিগত অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি সব সুদের হার নির্ধারণ না করলেও ব্যাংকগুলোর পারস্পরিক রাতারাতি ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করে, যা থেকে গৃহঋণ, গাড়ি ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার নির্ভর করে। সুদ বেশি হলে বিনিয়োগ ও ভোগ কমে গিয়ে অর্থনীতি শ্লথ হতে পারে। আবার সুদ খুব কম হলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। মহামারির পর মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে একসময় সুদ দ্রুত বাড়ানো হয়েছিল, পরে ধাপে ধাপে কমানো শুরু হয়।
স্বাধীনতার ধারণা কোথা থেকে
আইনপ্রণেতারা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপ থেকে দূরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করেছিলেন। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মেয়াদ দীর্ঘ হওয়ায় কোনো প্রেসিডেন্ট একাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলাতে পারেন না। তহবিলের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি কংগ্রেসের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই স্বাধীনতাই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি বৈশ্বিক আস্থার বড় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

এত বড় সংঘাত কি আগে দেখা গেছে
ইতিহাস বলছে, আগের প্রেসিডেন্টরাও কখনো কখনো সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে বরখাস্তের হুমকি দেওয়া বা ফৌজদারি তদন্তের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। বিচার বিভাগের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই তদন্ত ও মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংস্কার প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক
ওয়াশিংটনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি ঐতিহাসিক ভবনের সংস্কার প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেড়েছে। শ্রম ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন এবং অ্যাসবেস্টস ও সিসার মতো ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান অপসারণের প্রয়োজনীয়তাকে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ট্রাম্প এই ব্যয় বৃদ্ধিকে অপচয় ও সম্ভাব্য অনিয়ম বলে আখ্যা দিলেও পাওয়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তদন্তের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে
পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হতে আর বেশি সময় নেই, তবে তিনি চাইলে পরিচালনা পর্ষদে আরও কয়েক বছর থাকতে পারেন। এতে ট্রাম্পের জন্য নিজের পছন্দের সদস্য বসানোর সুযোগ বিলম্বিত হতে পারে। আবার আদালতের রায় ও তদন্তের গতিপ্রকৃতি ভিন্ন দিকে গেলে শূন্যতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই দ্বন্দ্ব রিপাবলিকান দলকেও বিভক্ত করছে, যা ভবিষ্যৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পড়ে, তবে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। এতে সরকারি ঋণের সুদ বাড়বে। আপাতত শেয়ারবাজার বড় ধরনের আতঙ্ক দেখায়নি, তবে পরিস্থিতির দিকে সবাই সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















