তীব্র গ্যাস সংকট, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ও চাঁদাবাজির চাপ একসঙ্গে চেপে বসায় দেশের রেস্তোরাঁ খাত এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে। এসব সংকট থেকে উত্তরণে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে হুমকি, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ ঘোষণার দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটি। এতে সভাপতি ওসমান গনি, মহাসচিব ইমরান হাসানসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
গ্যাস সংকট ও এলপিজি বাজারের বাস্তবতা
সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বর্তমানে এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ রেস্তোরাঁ প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। যারা কিনতে বাধ্য হচ্ছে, তারা ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে কিনছে। এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকারের উপদেষ্টা পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উদ্যোগ বা বক্তব্য নেই। ভোক্তা অধিদপ্তরের কিছু লোকদেখানো জরিমানায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং ব্যবসায়ীরা আরও চাপে পড়েছেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও সংকট কাটে
নি
ইমরান হাসান বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল। অতীতের অন্যায়, নির্যাতন ও জুলুম থেকে মুক্তির আশা করা হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংকট কমার বদলে বেড়েই চলেছে, যা রেস্তোরাঁ খাতকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ব্যবসার চাপ
নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে। অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। এতে গ্রাহক কমছে, আবার দাম না বাড়ালে লোকসান বাড়ছে। ফলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
পাইপলাইন গ্যাস বন্ধ ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অতীতে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস সংকট দেখিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়, যদিও এ খাতে মোট গ্যাস ব্যবহারের হার ছিল খুবই সামান্য। এর ফলে আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের বাজার একটি বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়। বর্তমানে তারাই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ইমরান হাসান।
চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ
বর্তমান সময়ে কিছু ব্যক্তি শ্রমিক সংগঠনের পরিচয় দিয়ে রেস্তোরাঁ মালিকদের হুমকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে বলে অভিযোগ করা হয়। এসব দাবিতে অপারগতা প্রকাশ করলে অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে। একটি কর্পোরেট গোষ্ঠী ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবহার করে রেস্তোরাঁ খাত দখলের ষড়যন্ত্র করছে বলেও দাবি করা হয়।

দাবি ও সতর্কবার্তা
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি সংকট নিরসন, ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি বন্ধ, মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাবারের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও নির্বাচনী ইশতেহারে রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা সুপরিকল্পনা ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
রেস্তোরাঁ মালিকরা জানান, এই খাতে সরাসরি প্রায় ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতে দেশে উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ খাবারের জন্য রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর করবে। অথচ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে, অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ না হলে এবং গ্যাস সংকটসহ চলমান সমস্যার সমাধান না হলে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















