ইরানে চলমান ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক বিনা মূল্যে সংযোগ দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির অধিকারকর্মীরা। বুধবার এই তথ্য নিশ্চিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক ইরানি বংশোদ্ভূত অধিকারকর্মী মেহদি ইয়াহইয়ানেজাদ। তিনি জানান, ইরানের ভেতরে সক্রিয় করা নতুন স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করে তারা বিনা মূল্যের ইন্টারনেট সেবা পরীক্ষা করেছেন এবং তা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর রয়েছে। অনলাইনে আরও কয়েকজন অধিকারকর্মীও একই দাবি করেছেন।
ইরানে সরকার যখন দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ দমনে বৃহস্পতিবার রাত থেকে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়, তখন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ হয়ে ওঠে স্টারলিংক। তবে স্টারলিংক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তখনো কোনো বক্তব্য দেয়নি।
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রাণহানি
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকারকর্মীরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ভোর পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২ হাজার ৫৭১ জনে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইরানে আর কোনো আন্দোলনে এত প্রাণহানি ঘটেনি। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার অস্থিরতার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন প্রথমবারের মতো পরোক্ষভাবে প্রাণহানির কথা স্বীকার করেছে। এক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে তারা জানায়, দেশে ‘অনেক শহীদ’ রয়েছে। তবে নিহতদের সংখ্যা আগে প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে বলা হয়, অনেক মরদেহ গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত ছিল। এই বক্তব্য আসে অধিকারকর্মীদের হিসাব প্রকাশের পর।
বিক্ষোভের সূচনা ও রূপ
দুই সপ্তাহেরও বেশি আগে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা সরাসরি শাসনব্যবস্থা ও ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে রূপ নেয়। তেহরানে বিক্ষোভের সময় দেয়ালে লেখা স্লোগান ও গ্রাফিতিতে খামেনির মৃত্যুর আহ্বান জানানো হয়েছে, যা ইরানে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নতুন প্রাণহানির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। তবে কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, নিহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে না।

এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি কড়া ভাষায় ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ইরানি জনগণের হত্যাকারী হিসেবে আখ্যা দেন।
মৃত্যুর হিসাব ও গ্রেপ্তার
মানবাধিকার সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৪০৩ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৪৭ জন সরকারপন্থী। নিহতদের মধ্যে ১২ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভে অংশ না নেওয়া ৯ জন সাধারণ নাগরিকও নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১৮ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি যাচাই কঠিন
ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিদেশ থেকে ইরানের পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইরান সরকার সামগ্রিক কোনো হিসাব দেয়নি।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মাত্র দুই সপ্তাহেই নিহতের সংখ্যা ২০২২ সালের মাহসা আমিনি বিক্ষোভের তুলনায় চার গুণ বেশি। তাদের আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

তেহরানের পরিস্থিতি
বিদেশে ফোন যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ার পর তেহরানের বাসিন্দারা জানান, শহরের কেন্দ্রে ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন রয়েছে। অনেক সরকারি ভবন পুড়ে গেছে, এটিএম ভাঙচুর হয়েছে এবং রাস্তায় লোকজন কম। দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে। অনেক ব্যবসায়ী জানান, নিরাপত্তা বাহিনী জোর করে দোকান খুলতে বলেছে।
রাস্তায় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনী, বিপ্লবী গার্ডের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজ এবং সাদা পোশাকের নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। কোথাও কোথাও মানুষ তাদের সঙ্গে তর্কেও জড়াচ্ছে।
স্টারলিংক টার্মিনাল খোঁজার অভিযোগ
উত্তর তেহরানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ স্টারলিংক টার্মিনাল খুঁজতে বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। যদিও স্যাটেলাইট ডিশ আইনত নিষিদ্ধ, বাস্তবে বহু মানুষ তা ব্যবহার করে আসছিল।

সরকারি বার্তা ও হুঁশিয়ারি
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানানো হয়েছে, মরদেহ দাফন ও মর্গ সেবা বিনা মূল্যে দেওয়া হবে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে আগে এসব সেবার জন্য উচ্চ ফি আদায় করা হচ্ছিল।
এদিকে সর্বোচ্চ নেতা খামেনি সরকারপন্থী সমাবেশে অংশ নেওয়া লোকজনের প্রশংসা করে বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কবার্তা। তিনি দাবি করেন, ইরানি জাতি শক্তিশালী এবং শত্রু সম্পর্কে সচেতন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ওই সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। একই সঙ্গে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ‘ঈশ্বরের শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















