দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো সুইস ঘড়ি নির্মাণের দুটি কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর মধ্যে এক ধরনের নীরব আত্মবিশ্বাস থাকে। সেই আত্মবিশ্বাসই বহন করেন জিরার পেরেগো ও উলিস নার্দিনের প্রধান নির্বাহী প্যাট্রিক প্রুনিয়ো। তাঁর বিশ্বাস, সত্যিকারের বিলাস কখনো চিৎকার করে না, নিখুঁত কারুকাজের মধ্য দিয়ে ধীরে কথা বলে।
দুবাই ওয়াচ উইক দুই হাজার পঁচিশে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মধ্যপ্রাচ্য তাঁর কাছে শুধু বাণিজ্যিক বাজার নয়, বরং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অঞ্চল। এই মঞ্চেই জিরার পেরেগো উন্মোচন করে লরেয়াতো থ্রি গোল্ড ব্রিজেস, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির আঠারো শত সাতষট্টির থ্রি ব্রিজেস ঐতিহ্য আর উনিশ শত পঁচাত্তরের লরেয়াতো নকশা একসূত্রে মিলেছে। লরেয়াতোর পঞ্চাশ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে তৈরি এই ঘড়ি সীমিত সংখ্যায় আনা হয়েছে, যা ব্র্যান্ডের ভাষায় এক ধরনের বিবর্তিত উত্তরাধিকার।

এই ঘড়ির প্রতিটি খুঁটিনাটিতে রয়েছে শিল্পীর নিখুঁত হাতের ছোঁয়া। চার শতাধিক হাতে পালিশ করা কোণ, তার মধ্যে অধিকাংশই ভেতরের দিকে বাঁকানো, শতাব্দী জুড়ে গড়ে ওঠা দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। নতুন ক্যালিবারের প্রতিটি যন্ত্রাংশ শেষ পর্যন্ত যিনি জোড়া দেন, তাঁর নিজ হাতে স্বাক্ষর করা থাকে সেখানে। গণউৎপাদনের যুগে এই নীরব স্বাক্ষরই বলে দেয়, আসলত্ব এখনো কতটা মূল্যবান।
অন্যদিকে একই প্রদর্শনীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় কথা বলে উলিস নার্দিন। যেখানে জিরার পেরেগো ধীরে এগোয় ঐতিহ্যকে ঘিরে, সেখানে উলিস নার্দিন বরাবরই নিয়ম ভাঙতে ভালোবাসে। দুই হাজার এক সালে প্রথম আসা ফ্রিক ঘড়ি আজও ঘড়ি জগতের সবচেয়ে সাহসী উদাহরণ। কোনো ডায়াল নেই, কোনো কাঁটা নেই, পুরো যন্ত্রটাই সময় দেখায়। এটি শুধু সময় জানানোর যন্ত্র নয়, সময় সম্পর্কে ভাবনার ধরন বদলে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা।
প্যাট্রিক প্রুনিয়োর নেতৃত্বে এই দুই প্রতিষ্ঠানের পথ আলাদা হলেও দর্শনে রয়েছে গভীর সংযোগ। তাঁর মতে, দুটিকেই একসূত্রে বাঁধে বৈধতা। সুইস ঘড়ি নির্মাণের ধারাবাহিক ইতিহাসে এই দুই প্রতিষ্ঠান প্রাচীনতমদের মধ্যে পড়ে এবং উচ্চ মানের যান্ত্রিক দক্ষতায় তারা অনন্য। পার্থক্য তৈরি হয় নকশা, সৃজনশীল প্রকাশ আর দর্শনে, আর সেই পার্থক্য তারা সচেতন ভাবে রক্ষা করে।

উলিস নার্দিনের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইউ আর ফ্রিক। এটি উলিস নার্দিন ও আরেক স্বাধীন ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের যৌথ সৃষ্টির ফল। এখানে ফ্রিকের ঘূর্ণায়মান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘুরে ঘুরে সময় দেখানোর এক অভিনব ব্যবস্থা। শুধু বাহ্যিক বদল নয়, ভেতরের যন্ত্রাংশের বড় অংশ নতুন করে সাজাতে হয়েছে। সীমিত সংখ্যায় তৈরি হলেও এই ঘড়ি আসলে একটি বার্তা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছেড়ে সহযোগিতায় গেলে কীভাবে নতুন সীমানা তৈরি করা যায়।
জিরার পেরেগোর ক্ষেত্রে পথটা আলাদা। এটি প্রকৃত অর্থেই একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যা অতীতে শুধু নিজের জন্য নয়, গোটা শিল্পের জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি করেছে। লরেয়াতো থ্রি গোল্ড ব্রিজেস সেই ধারাবাহিকতার আধুনিক রূপ। অতীতকে নকল না করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন ক্যালিবার, পরিমিত নকশা আর দীর্ঘমেয়াদি প্রাসঙ্গিকতার দিকে নজর দেওয়া হয়েছে।
দুটি ভিন্ন পরিচয় এক নেতৃত্বে ধরে রাখার রহস্য সম্পর্কে প্রুনিয়ো বলেন, স্পষ্ট সীমানাই মূল চাবিকাঠি। আলাদা পণ্য দল, আলাদা সৃজনশীল সিদ্ধান্ত, কোনো রকম মিশ্রণ নয়। কিছু কারিগরি দক্ষতা ভাগাভাগি হলেও নকশা ও দর্শনে কোনো আপস নেই। এই সীমারেখা ঝাপসা হলেই ব্র্যান্ডের মানে হারিয়ে যায়।

সহযোগিতা প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। সৃজনশীল ধারণার অভাব নেই, অভাব রয়েছে প্রাসঙ্গিকতার। প্রতিটি প্রকল্পকে ব্র্যান্ডের গল্পকে শক্তিশালী করতে হয়, সংগ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে হয়। সেই মানদণ্ডে না পড়লে বহু প্রকল্প থেমে যায়।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। এখানে সংগ্রাহকরা শুধু দাম বা সীমিত সংখ্যার দিকে তাকান না। তারা যন্ত্রের জটিলতা বোঝেন, কারুকাজের মূল্য দেন, প্রশ্ন করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অঞ্চলের ভিত্তি, সৌদি আরব দ্রুত এগোচ্ছে, কুয়েতের সংগ্রাহক সমাজ বহুদিনের পরিণত। এই অঞ্চলকে তিনি কোনো প্রান্তিক বাজার হিসেবে দেখেন না, বরং কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন।
দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নে তাঁর উত্তর সহজ। ঘড়ি নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি পথচলা। বিশ্বাস, মূল্যবোধ আর ধৈর্যের ওপর দাঁড়ানো সম্পর্কই এখানে কাজ করে। তাৎক্ষণিক লেনদেন দিয়ে এই শিল্প টিকে থাকে না।

সৃজনশীলতা আর বাণিজ্যের ভারসাম্য নিয়ে প্রুনিয়োর মত, আর্থিক সাফল্য লক্ষ্য নয়, ফল। পণ্য যদি সত্যিকারের হয়, যান্ত্রিকভাবে নিখুঁত হয়, আবেগ জাগাতে পারে, তাহলে তার দর্শক নিজেই তৈরি হয়। সংখ্যার পেছনে দৌড়ালে স্বল্পমেয়াদে লাভ হতে পারে, কিন্তু ব্র্যান্ডের আত্মা ক্ষয়ে যায়।
লরেয়াতো থ্রি গোল্ড ব্রিজেসের শত শত পালিশ করা কোণ কেন গুরুত্বপূর্ণ, যখন বেশিরভাগই খালি চোখে দেখা যায় না, এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর একটাই। কারণ এটি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। যারা সত্যিকার অর্থে ঘড়ি বোঝেন, তারা এই পরিশ্রম অনুভব করেন। এই কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শতাব্দীর জ্ঞান আর মানুষের নিবেদন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দৃষ্টিতে স্বচ্ছতা আর শিক্ষা আরও জরুরি হয়ে উঠবে। সংগ্রাহকেরা জানতে চান কীভাবে ঘড়ি তৈরি হয়, কেন তা গুরুত্বপূর্ণ। এই খোলামেলা মনোভাবই শিল্পকে এগিয়ে নেবে। মধ্যপ্রাচ্য ইতিমধ্যেই তা বুঝেছে, বিশ্ব ধীরে ধীরে শিখছে।
প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে ফিরে যেতে যেতে দেখা যায়, কেউ ম্যাগনিফায়ারের নিচে লরেয়াতো থ্রি গোল্ড ব্রিজেসের সূক্ষ্ম রেখা দেখছেন, কেউ প্রথমবার ইউ আর ফ্রিকের ঘূর্ণায়মান যন্ত্র দেখে মুগ্ধ। দুই ভাষা, এক দর্শন। সততার সঙ্গে তৈরি করা, আলাদা পরিচয় রক্ষা করা, আর বিশ্বাস রাখা যে যারা বোঝেন, তারা ঠিকই এসে পৌঁছাবেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















