ওয়াশিংটনে আজ এক উচ্চঝুঁকির বৈঠকের মুখোমুখি হচ্ছে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে বসছেন ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎসফেল্ট। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার পর এই বৈঠককে ঘিরে ইউরোপজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৌশলগত দ্বীপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। খনিজসমৃদ্ধ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার যুক্তি, অন্যথায় রাশিয়া কিংবা চীন সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং বলপ্রয়োগের হুমকি দায়িত্বজ্ঞানহীন।

সংকট এড়াতে কূটনৈতিক চেষ্টা
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং এমন একটি কূটনৈতিক পথ খোঁজা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আংশিকভাবে হলেও প্রশমিত হয়। নর্ডিক অঞ্চলের রাজনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এমন কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ নয় বরং নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে যাবে।
ডেনমার্কে আশঙ্কা রয়েছে, এই বৈঠক প্রকাশ্য অপমানের রূপ নিতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে হোয়াইট হাউসে হওয়া অতীত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন কোপেনহেগেন ও নুক।
ডেনমার্কের সঙ্গে ঐক্যের বার্তা গ্রিনল্যান্ডের
সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থানেও স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর দেওয়া হচ্ছিল, এখন সেখানে ডেনমার্কের সঙ্গে ঐক্যের বার্তাই প্রধান। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, এমন সময়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে জুয়া খেলার সুযোগ নেই, যখন অন্য একটি দেশ দখলের কথা বলছে। তার ভাষায়, বর্তমান বাস্তবতায় গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ হিসেবেই ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোৎসফেল্টও একই সুরে জানিয়েছেন, ডেনমার্কের অংশ হিসেবেই বর্তমান গ্রিনল্যান্ডকে তারা বেছে নিচ্ছেন।
ট্রাম্পের কঠোর প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটনে এই বার্তা তেমন প্রভাব ফেলেনি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সঙ্গেই থাকতে চায়—এই বক্তব্য উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নন এবং এটি সংশ্লিষ্ট নেতাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নানা পরিকল্পনার আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। এর মধ্যে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক প্রলোভনের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতার চেষ্টা করার ধারণাও রয়েছে।

সীমান্ত বদলের প্রশ্নে ইউরোপের অবস্থান
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, এই সংকট কেবল গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল নীতির সঙ্গে জড়িত। তার মতে, শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্ত বদলানো যায় না এবং কোনো জনগোষ্ঠীকে কেনাবেচা করা গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপের একাধিক প্রভাবশালী দেশ ইতোমধ্যেই ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউসের বৈঠক শুধু দুই মিত্র দেশের আলোচনাই নয়, বরং আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















