নিউইয়র্কে বিলাসবহুল ডিপার্টমেন্ট স্টোর জগতের এক শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী নামগুলো এক ছাদের নিচে আনার যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ল ঋণের চাপে। নেম্যান মার্কাস অধিগ্রহণের এক বছরের মধ্যেই দেউলিয়া সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছে সাকস গ্লোবাল। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসবহুল ফ্যাশন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেউলিয়া আবেদন ও বর্তমান পরিস্থিতি
মঙ্গলবার গভীর রাতে আদালতে দাখিল করা নথিতে সাকস গ্লোবাল জানায়, তারা দেউলিয়া সুরক্ষা চেয়েছে। নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ এক বিলিয়ন থেকে দশ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এটি মহামারির পর মার্কিন খুচরা বাজারে অন্যতম বড় পতন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আপাতত তাদের সব স্টোর খোলা থাকবে।

নতুন নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় রদবদল
এই সংকটের মধ্যেই সাকস গ্লোবালের নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন নেম্যান মার্কাসের সাবেক প্রধান জিওফ্রয় ভ্যান রেমডঙ্ক। তিনি রিচার্ড বেকারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন, যিনি নেম্যান মার্কাস অধিগ্রহণের মূল কারিগর ছিলেন। পাশাপাশি নেম্যান মার্কাসের আরও দুই সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ডার্সি পেনিক ও লানা টোডোরোভিচকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ঋণ পুনর্গঠনের চেষ্টা ও আদালতের ভূমিকা
আদালত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাকস গ্লোবাল এখন ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে চায়। প্রয়োজনে নতুন মালিক খোঁজার পথও খোলা রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটির স্টোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আদালতে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।
বিলাসবহুল ব্র্যান্ডদের বড় পাওনা
দেউলিয়া নথিতে দেখা গেছে, অসুরক্ষিত পাওনাদারদের তালিকায় রয়েছে বিশ্বের নামী বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো। সবচেয়ে বেশি পাওনা রয়েছে শ্যানেলের, যার অঙ্ক প্রায় একশ ছত্রিশ মিলিয়ন ডলার। গুচ্চির মালিক কেরিংয়ের পাওনা প্রায় ষাট মিলিয়ন ডলার এবং এলভিএমএইচের পাওনা ছাব্বিশ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে সাকস গ্লোবালের পাওনাদারের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিগ্রহণের পর বাড়তে থাকা ঋণের চাপ
২০২৪ সালে কানাডার হাডসনস বে কোম্পানির হাত ধরে নেম্যান মার্কাস অধিগ্রহণ করে সাকস। পরে সাকস ফিফথ অ্যাভিনিউ, বার্গডর্ফ গুডম্যান ও নেম্যান মার্কাসকে একত্র করে গড়ে তোলা হয় সাকস গ্লোবাল। প্রায় দুই দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির বড় অংশই ছিল ঋণনির্ভর। ফলে বৈশ্বিক বিলাসবহুল পণ্যের বিক্রি ধীরগতির মধ্যে পড়তেই প্রতিষ্ঠানটি চাপে পড়ে।
বিক্রি কমা ও ক্রেতা হারানোর বাস্তবতা
গত বছর থেকেই সাকস গ্লোবাল সরবরাহকারীদের সময়মতো অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হতে থাকে। এর ফলে অনেক ব্র্যান্ড পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। স্টোরে পণ্যের স্বল্পতা তৈরি হলে ক্রেতারা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে একই সময়ে ব্লুমিংডেলসের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা শক্তিশালী বিক্রির তথ্য জানায়।
ঐতিহ্যবাহী নাম, কিন্তু বদলে যাওয়া বাজার
১৮৬৭ সালে অ্যান্ড্রু সাকসের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা সাকস ফিফথ অ্যাভিনিউ ছিল শ্যানেল, বারবেরি কিংবা কুচিনেল্লির মতো একচেটিয়া ব্র্যান্ডের ঠিকানা। কিন্তু অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্ব স্টোরে বিক্রির প্রবণতা এই ঐতিহ্যবাহী ডিপার্টমেন্ট স্টোর মডেলকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে ফেলেছে।
আর্থিক সংকটের শেষ মুহূর্ত
নগদ সংকট সামাল দিতে গত মাসে নেম্যান মার্কাসের বেভারলি হিলসের প্রধান স্টোরের জমি বিক্রি করতে হয় সাকস গ্লোবালকে। তবুও ডিসেম্বরের শেষে তারা একশ মিলিয়ন ডলারের বেশি সুদের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া আবেদনের পথ খুলে দেয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















