আন্দোলনের মধ্যকার আঞ্চলিক হুমকি
ইরানের শাসকগোষ্ঠী অভূতপূর্ব প্রতিবাদের মুখে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। চলমান আন্দোলন শুরু হয়েছে অস্বাভাবিক খাদ্যদামের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কিন্তু এখন এটি দমনমূলক শাসনের প্রতীক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তেহরানের কর্মকর্তারা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কে নিযুক্ত কূটনীতিকদের জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ করলে ওই দেশগুলিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এই বক্তব্য আন্দোলনের গভীরতা ও সরকারের উদ্বেগকে প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ২,৬০০ মানুষ নিহত এবং ১৮ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে।
বিক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়াও বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আটককৃতদের ফাঁসি দেওয়া হলে তিনি ‘শক্ত পদক্ষেপ’ নেবেন, তবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। ইসরায়েলি নেতারা সম্ভাব্য ব্যবস্থা বিবেচনা করতে নিরাপত্তা বৈঠক করেছেন। কাতারের আল‑উদেইদ ঘাঁটির কিছু অনাবশ্যক কর্মীকে সতর্কতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যদিও জরুরি সৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দেয় যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সবাই উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করছে।
রাজনৈতিক পরিণতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা
কয়েক বছরের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ধর্মীয় দমনমূলক শাসনের ফলে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। দ্রুত খাদ্যমূল্য ও কর্মসংস্থান সংকটের প্রতিবাদ জানাতে জানুয়ারির শুরুতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল; নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অনেকের মৃত্যু হলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের ইরান ছাড়তে বলেছে এবং তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর উপর শুল্ক বাড়িয়েছে। ট্রাম্প বলেন যে “সহায়তা পথে রয়েছে”, তবে কী ধরনের সহায়তা তা জানাননি।
ইরানি কর্মকর্তারা প্রতিবেশী সরকারগুলোর সাথে যোগাযোগ করে বলছেন, তারা সংঘাত চান না, কিন্তু হামলা হলে প্রতিরোধ করবে। সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি কাতার, আমিরাত ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফের সাথে অঘোষিত আলাপ স্থগিত করেছে, যা সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বাইরের দুনিয়া থেকে তথ্য পাওয়া কঠিন, কারণ ইরানের সরকার ইন্টারনেট সীমিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের বহিষ্কার করেছে। হত্যার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সবাই একমত যে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। ইরানের কর্মকর্তারা মৃতের সংখ্যা স্বীকার না করলেও শত শত মৃত্যু মেনে নিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান হিভি সতর্ক করেছেন যে এই দমন অব্যাহত থাকলে তেহরান আরও একঘরে হয়ে পড়বে।
ট্রাম্পের বক্তৃতায় যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইবে। তবুও, প্রেসিডেন্ট বলছেন “সব ধরনের বিকল্প উন্মুক্ত।” ইরানের শাসকদের জন্য এটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তারা শান্তিপূর্ণ সমাধান চয়ন করবে না আরও কঠোর পথে যাবে—এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ককে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে যে মরদেহের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, বিক্ষোভকারীদের পাল্টা প্রতিরোধ ও আহত মানুষের কাতর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তেহরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে আন্দোলনকারীরা “বিদেশি উস্কানিদাতা,” কিন্তু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শাখার ভেতরেও দমন‑নীতি নিয়ে দ্বিমত দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কবে হামলা চালাতে পারে—এমন গুজব সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন ইন্টারনেট ও গণমাধ্যম বন্ধ থাকায় আন্দোলনকারীরা সংগঠিত হতে পারছে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এটিই শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা; সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এই অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যের জোটগত রাজনীতিতেও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। যদি সঙ্কট তাড়াতাড়ি সমাধান না হয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রভাবিত হবে এবং পুরো অঞ্চল জুড়ে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















