কেন গোষ্ঠী থেরাপি এখনও কম ব্যবহৃত
মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা বলতে অনেকেই শুধু একক থেরাপির কথা ভাবেন, যেখানে একজন রোগী ও একজন থেরাপিস্ট মুখোমুখি কথা বলেন। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গোষ্ঠী থেরাপি একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে আছে। ভক্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ক্রিস্টি টেটের গল্প উঠে এসেছে। তিনি যখন তরুণ আইনজীবী ছিলেন, তখন একাকীত্ব, বুলিমিয়া ও আত্মহত্যার চিন্তায় ভুগছিলেন। বহু বছর ব্যক্তিগত থেরাপি করে ফল না পেয়ে তিনি এক বন্ধুর পরামর্শে একটি ছোট গোষ্ঠীতে যোগ দেন। সেখানে পাঁচ‑ছয়জন অপরিচিত মানুষ এবং একজন থেরাপিস্ট প্রতি সপ্তাহে মিলিত হয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া ভাগাভাগি করতেন। এই পরিবেশে টেট দেখতে পান যে অন্যদের সৎ প্রতিক্রিয়া ও মিল অনুভব করা তাঁর বিচ্ছিন্নতা ভেঙে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং এটিই তাঁর জীবন পাল্টে দিয়েছে বলে মনে করেন।
এরপরও যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র অল্পসংখ্যক ক্লিনিক গোষ্ঠী সেশন পরিচালনা করে। অনেকেই ধারণা করেন যে অন্যদের সঙ্গে সময় ভাগাভাগি করলে ব্যক্তিগত সহানুভূতি কমে যাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাগাভাগির মধ্যেই লুকিয়ে আছে নিরাময়ের শক্তি। অংশগ্রহণকারীরা শোনা, সহমর্মিতা ও সীমারেখা তৈরির অনুশীলন করেন। লজ্জা বা একাকীত্বে ভোগা ব্যক্তিরা অন্যদের কাছে একই সংকট দেখে স্বস্তি ও সংযোগের অনুভূতি পান। গোষ্ঠী সেশন ব্যক্তিগত থেরাপির তুলনায় প্রায় অর্ধেক খরচ সাশ্রয় করতে পারে এবং গবেষণায় দেখা গেছে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, খাওয়ার ব্যাধি ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় গোষ্ঠী থেরাপি কম-বেশি একই রকম কার্যকর।
ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
গোষ্ঠী থেরাপির শিকড় শতাব্দী প্রাচীন। ১৯০৫ সালে বোস্টনের চিকিৎসক জোসেফ প্র্যাট যক্ষ্মা রোগীদের নিয়ে প্রথম গোষ্ঠী সেশন চালু করেন এবং দেখেন পারস্পরিক সমর্থন চিকিৎসার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মনোবিশ্লেষক উইলফ্রেড বায়ন যুদ্ধাহত সৈন্যদের নিয়ে গোষ্ঠীর তত্ত্ব উন্নয়ন করেন। ১৯৬০‑এর দশকের এনকাউন্টার গ্রুপ আন্দোলনে গোষ্ঠী প্রক্রিয়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ে জনপ্রিয় হয়, কিন্তু মূলধারার থেরাপিতে এটি পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারেনি।

সমর্থকেরা মনে করছেন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং টেলিহেলথ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দূরদূরান্তের মানুষ একত্র হতে পারছে। চিকিৎসক সংকট ও ব্যয়বহুল একক থেরাপি মানুষকে বিকল্প ভাবতে বাধ্য করছে। কিছু বীমা কোম্পানি গোষ্ঠী সেশন কভার করতে শুরু করেছে যদিও অনেক জায়গায় এটি এখনও সীমিত।
একটি সফল গোষ্ঠী সেশনে কাঠামো খুব গুরুত্বপূর্ণ। থেরাপিস্ট নিয়ম নির্ধারণ করে অংশগ্রহণকারী বাছাই করেন এবং সবার কথা শোনা নিশ্চিত করেন। গোপনীয়তা রক্ষা ও নিয়মিত উপস্থিতি সেশনকে ফলপ্রসূ করে। মহামারির সময় অনেক গোষ্ঠী অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়েছিল, যা দেখায় যে ভার্চুয়াল আড্ডাও প্রভাব ফেলতে পারে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, গোষ্ঠী থেরাপি ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে—মানসিক সেবা সহজলভ্য করা, সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ফলাফল উন্নত করা। এজন্য থেরাপিস্টদের প্রশিক্ষণ, বীমা কভারেজ এবং প্রচারের প্রয়োজন। একাকীত্ব, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা যখন বাড়ছে, তখন সমষ্টিগত নিরাময় পদ্ধতি ব্যক্তিগত থেরাপির পরিপূরক হতে পারে। গোষ্ঠী থেরাপি কোনও ম্যাজিক নয়; অংশ নিতে ইচ্ছা ও ধৈর্য লাগবে। তবে যারা ব্যয়বহুল বা অপ্রাপ্য একক সেশন নিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি শক্তিশালী বিকল্প।
গোষ্ঠী থেরাপি আরও ব্যাপকভাবে গ্রহণ করতে হলে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক বাধা অতিক্রম করতে হবে। থেরাপিস্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার যাতে তারা সক্রিয় আলোচনা পরিচালনা করতে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারেন। চিকিৎসা বিমা কোম্পানিগুলোকে গোষ্ঠী সেশন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে কম আয়ের মানুষও এই সেবা নিতে পারে। সম্প্রদায় কেন্দ্র, স্কুল ও কর্মস্থলে গোষ্ঠী সেশন চালু করলে মানুষ এই পদ্ধতির সাথে পরিচিত হতে পারবে এবং লজ্জা ও ভুল ধারণা কমবে। গবেষকরা মনে করেন ডিজিটাল যুগে সমাজ আরও একাকী ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; এ অবস্থায় গোষ্ঠী থেরাপি পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহমর্মিতা তৈরির একটি উপায় হতে পারে।
শিশু ও কিশোর সহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই পদ্ধতি থেকে উপকৃত হতে পারে; তবে তাদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। থেরাপিস্টরা বলছেন যে অনেক বাবা‑মা ও অভিভাবক এখনও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন; এই মনোভাব না বদলালে গোষ্ঠী থেরাপির প্রসার সম্ভব হবে না। তাই প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকারকর্মীরা জোর দিচ্ছেন যে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা যেন পণ্য না হয়ে ওঠে; বরং কমিউনিটি‑ভিত্তিক সহায়তা হিসেবে গড়ে উঠে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
























