ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চীনের জন্য নতুন করে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে বেইজিং যে কৌশল নিয়ে এগোচ্ছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর কড়া শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে চাপ আরও বাড়িয়েছেন।
চীন-ইরান সম্পর্কের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছরে চীন প্রতিদিন গড়ে প্রায় তেরো লাখ আশি হাজার ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে, যা চীনের মোট তেল আমদানির বড় একটি অংশ। এই তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে বিভিন্ন পথে চীনে পৌঁছায় বলে বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। ফলে ইরানের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নাড়িয়ে দেয়।

নতুন শুল্ক হুমকি ও বাণিজ্য চাপ
ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে পঁচিশ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। এই ঘোষণায় স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক যেখানে আগেই জটিল, সেখানে এই সিদ্ধান্ত চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
স্থল ও রেলপথে চীনের স্বপ্ন
ইরান শুধু জ্বালানির উৎস নয়, চীনের স্থলভিত্তিক বাণিজ্য পথেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্প্রতি দুই দেশ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করেছে, যার মাধ্যমে চীন থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগছে মাত্র পনেরো দিন। সমুদ্রপথে যেখানে প্রায় চল্লিশ দিন সময় লাগে, সেখানে এই রেলপথ চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানই একে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উদ্যোগে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোডে ইরানের ভূমিকা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কয়েক বছর আগে বেইজিং ঘোষণা দিয়েছিল, আগামী পঁচিশ বছরে ইরানে বিপুল বিনিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে তেল পাইপলাইনসহ নানা বড় প্রকল্পের পরিকল্পনাও ছিল। শুধু তাই নয়, অঞ্চলটিতে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চীন ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতাও করেছিল।

রাজনৈতিক ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
কিন্তু ইরানের বর্তমান অস্থিরতা চীনের এই সব পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে চীন তার তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারকে হারাতে পারে। এর আগে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেখানে চীনের বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বড় ধাক্কা খেয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
বেইজিংয়ের কঠিন ভারসাম্য
সব মিলিয়ে ইরানের পরিস্থিতি চীনের সামনে কঠিন এক ভারসাম্যের পরীক্ষা তৈরি করেছে। একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও আঞ্চলিক রাজনীতির জটিলতা। এই সমীকরণ সামলাতে গিয়ে বেইজিংকে আগামী দিনে অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















