একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান কীভাবে হয়? এ নিয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, ভেঙে পড়ে- ধীরে ধীরে তারপর হঠাৎ করে।
ইরানের বিক্ষোভকারী এবং তাদের বিদেশি সমর্থকরা আশা করছিলেন যে, তেহরানের ইসলামি শাসন ব্যবস্থা হঠাৎ করেই শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তবে বর্তমান অবস্থা হলো, যদিও এর পতন হচ্ছে কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে।
গত দুই সপ্তাহের অস্থিরতা ইরানের শাসক গোষ্ঠীর জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে।
ইরানিদের ক্ষোভ এবং হতাশা এর আগেও আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, কিন্তু সর্বশেষ বিস্ফোরণটি ইরানের উপর গত দুই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের চালানো সামরিক আঘাতের ফলে ত্বরান্বিত হয়েছে।
যদিও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কঠোর চাপে থাকা ইরানিদের জন্য নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
অকার্যকর পারমাণবিক চুক্তির অধীনে ২০১৫ সালে প্রত্যাহার করা জাতিসংঘের সমস্ত নিষেধাজ্ঞা সেপ্টেম্বরে পুনরায় আরোপ করে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং ফ্রান্স- যা দেশটির অর্থনীতির জন্য সবশেষ ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশেরও বেশি ছিল। এমনকি ডিসেম্বরে রেকর্ড সর্বনিম্নে পৌঁছায় মুদ্রা রিয়ালের মান।
ইরানি শাসন ব্যবস্থা যদিও প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে, তবুও লক্ষণ বলছে যে এটি এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এখনও অনুগত রয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে সময় এবং অর্থ ব্যয় করে বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়নের একটি বিস্তৃত এবং নির্মম নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
গত দুই সপ্তাহে, নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর গুলি চালাতে শাসকগোষ্ঠীর দেওয়া নির্দেশ তারা মেনে চলেছে।
ফলস্বরূপ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের অবসান হয়েছে- যতদূর আমরা বলতে পারি যে, এমন একটি দেশে যেখানে শাসকরা যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ব্ল্যাকআউট জারি করেছে।
বিক্ষোভ দমনের ক্ষেত্রে সম্মুখ সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছে ইরানি বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি, যা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ ও সরকার ব্যবস্থাকে রক্ষা করাই যাদের প্রধান কাজ। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির কাছেই যারা সরাসরি জবাবদিহি করে।

আইআরজিসিতে প্রায় দেড় লক্ষ সশস্ত্র সৈন্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যারা ইরানের প্রচলিত সশস্ত্র সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে। ইরানের অর্থনীতিতেও একটি প্রধান খেলোয়াড় এই বাহিনী।
ক্ষমতা, অর্থ, দুর্নীতি এবং আদর্শের এক শক্তিশালী মিশ্রণ, যাদের কাছে চলমান সিস্টেমকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
বাসিজ মিলিশিয়া নামে আইআরজিসির একটি সহায়ক বাহিনীও রয়েছে, যা একটি স্বেচ্ছাসেবক আধাসামরিক বাহিনী। এর লক্ষ লক্ষ সদস্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
কিছু পশ্চিমা পরিসংখ্যান অনুসারে, এই বাহিনীর লক্ষ লক্ষ সক্রিয় সদস্য রয়েছে, যা এখনও একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যা। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর চালানো দমন-পীড়নের ক্ষেত্রে চরম পর্যায়ে রয়েছে বাসিজ বাহিনী।
২০০৯ সালে আমি তেহরানে আইআরজিসি এবং বাসিজকে অভিযান চালাতে দেখেছি, যখন তারা বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিশাল বিক্ষোভ দমন করতে এগিয়ে এসেছিল। বাসিজের স্বেচ্ছাসেবকরা রাবারের ট্রাঞ্চিয়ন এবং কাঠের লাঠি নিয়ে রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়েছিল।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে তাদের পিছনেই ছিল পোশাকধারী লোকজন। তেহরানের প্রশস্ত রাস্তাগুলোতে বিক্ষোভকারীদের উপর নেমে আসে মোটরসাইকেল স্কোয়াড।
দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, রাস্তাঘাট স্থবির করে রাখা বিক্ষোভগুলি ছাত্রদের ছোট ছোট দলে পরিণত হয়, যারা স্লোগান দেয় এবং আবর্জনার স্তুপে আগুন ধরিয়ে দেয়।
সন্ধ্যার পর, লোকেরা তাদের বারান্দা এবং ছাদে গিয়ে প্রার্থনা করত, যেমনটি তাদের বাবা-মা শাহের বিরুদ্ধে করেছিলেন।
আপাতদৃষ্টিতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার অর্থ এই নয় যে, সর্বোচ্চ নেতা কিংবা তার সহকারীরা নিশ্চিন্তে থাকতে বা আরাম করতে পারবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। বর্তমান শাসন ব্যবস্থার পতন চাওয়া লক্ষ লক্ষ ইরানিও অবশ্যই বিরক্তি এবং ক্রোধে জ্বলছে।

তেহরানে, সরকার এবং সর্বোচ্চ নেতা যে চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন সেটি থেকে তারা কিছুটা মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজছেন বলে মনে হচ্ছে।
দেশটির সরকার তাদের বক্তব্যে যেমন প্রতিবাদ করছে তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় আলোচনা শুরুর প্রস্তাবও দিচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষ কীভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে সেটি বোঝা কঠিন, কারণ এর আগের আলোচনাগুলোও ব্যর্থ হয়েছিল।
তবে আলোচনা ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে কিছুটা সময় দিতে পারে, বিশেষ করে যদি ট্রাম্পকে এটি নিশ্চিত করা যায় যে, যত কঠিনই হোক না কেন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।
চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বলেছেন যে, ইরানের সাথে ব্যবসা চালাতে ইচ্ছুক এমন যেকোনো দেশের পণ্যের উপর তিনি ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন।
তবে, এটি কীভাবে কাজ করবে তা বোঝা কঠিন। কারণ ইরানের বেশিরভাগ তেলের ক্রেতাই চীন।
গত শরতে নিজেদের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ থামাতে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হন ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এপ্রিল মাসে বেইজিংয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
যেখানে বিশ্বের দুই পরাশক্তি নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করবে। কেবল ইরানের উপর চাপ বজায় রাখতে এই শীর্ষ সম্মেলনকে বিপন্ন করতে বা ব্যাহত করতে চাইবেন ট্রাম্প?
তেহরানে, বয়স্ক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা রক্ষা করা। আরও বিক্ষোভের সূত্রপাত হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া আশা করা যেতে পারে।

এই শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি সুবিধা হলো বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংগঠিত নেতৃত্বের অভাব। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র তাদের নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু তার পরিবারের ইতিহাস এবং ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তার আবেদন সীমিত বলেই মনে হচ্ছে।
তেহরানের ধর্মগুরু এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কোন বিষয়গুলো উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে সেটির একটি নজির তারা নিজেদের সাবেক মিত্র, সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডিন্ট বাশার আল-আসাদ এর পরিণতি থেকে পেয়েছে।
যিনি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকে যখন একটি সুসংগঠিত বিদ্রোহী আক্রমণের মুখোমুখি হন তখন সৌদি আরব এবং আরব লীগ তাকে ধীরে ধীরে পুনর্বাসিত করছিল।
তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই মিত্র রাশিয়া এবং ইরান উভয়ই তাকে বাঁচাতে ইচ্ছুক ছিল না বা সম্ভবত সক্ষম ছিল না। কয়েকদিনের মধ্যেই, আসাদ এবং তার পরিবার মস্কোতে নির্বাসনে চলে যান।
একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তারপর হঠাৎ করে ধসে পড়ে। আসাদের সিরিয়া যখন ভেঙে পড়ে, তখন তা খুব দ্রুত ঘটে যায়।
তেহরানের জন্য আরেকটি উদাহরণ হতে পারে, ২০১১ সালে তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রপতি বেন আলীর পতন, যখন সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে বিক্ষোভকারীদের রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিল।
বেন আলীর পতনের ফলে মিশরের রাজা হোসনি মুবারকের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র বাহিনী যদি তাদের নিজস্ব অবস্থান বাঁচানোর জন্য তাকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য না করতো, তাহলে তিনি হয়তো বিশাল বিক্ষোভ থেকে বেঁচে যেতে পারতেন।
ইরানেও কি এমনটা হতে পারে? হয়তো, এখনও না।
ইসলামি শাসন ব্যবস্থার বিরোধীরা দেশে এবং বিদেশে আরও চাপ এবং বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের উত্থানের আশা করবে, যাতে পতনের প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হয়, ধীরে ধীরে থেকে হঠাৎ করে।
বিবিসি বাংলা
Sarakhon Report 



















