ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে টানা ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে যখন হাজারো প্রাণ ঝরে গেছে, তখন একই দ্বীপের একটি বনাঞ্চল প্রায় অক্ষত থেকেছে। জাপানি বাণিজ্য সংস্থা মারুবেনির পরিচালিত পুনরায় বনায়ন প্রকল্পটি এখন পরিবেশবিদ ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে। অতিরিক্ত বন উজাড়কে দুর্যোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, পরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনা কীভাবে ঝুঁকি কমাতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে এই প্রকল্প।
বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত সুমাত্রা
গত বছরের নভেম্বর মাসে সুমাত্রার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল ব্যাপক। প্রাণ হারান এক হাজারেরও বেশি মানুষ, যা দুই হাজার আঠারোর সুলাওয়েসি ভূমিকম্পের পর দেশটির অন্যতম বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে দীর্ঘদিনের বন উজাড়ের ফলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়াকে বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মারুবেনির বন কেন ভিন্ন রইল

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ সুমাত্রার পালেমবাং শহর থেকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে পাহাড়ি এলাকায় মারুবেনির পরিচালিত বনাঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষতি না হওয়ায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মুসি হুতান পারসাদার প্রধান কেই ওয়াতানাবে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মাথায় রেখেই শুরু থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দুই দশকের পরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনা
দুই হাজার সালের পর থেকে মারুবেনি প্রায় দুই লাখ নব্বই হাজার হেক্টর বনাঞ্চল পরিচালনা করছে, যা টোকিও অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ত্রিশ শতাংশ বড়। এর মধ্যে এক লাখ হেক্টরে কাগজ কলের জন্য কাঠ উৎপাদন করা হয়। এই প্রকল্পে ঠিকাদারসহ প্রায় সাত হাজার মানুষ কাজ করেন এবং সেখানে অবস্থান করছেন একাধিক জাপানি নাগরিকও।
প্রতি বছর যে পরিমাণ ইউক্যালিপটাস গাছ কাটা হয়, ঠিক সমপরিমাণ এলাকায় নতুন করে গাছ লাগানো হয়। এতে বনাঞ্চলের আয়তন অপরিবর্তিত থাকে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।

নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির কড়া ব্যবস্থা
বন ব্যবস্থাপনার মান রক্ষায় একটি বড় অডিট দল নিয়মিত নজরদারি চালায়। আন্তর্জাতিক মানের টেকসই বন ব্যবস্থাপনা সনদও পেয়েছে এই প্রকল্প। পাশাপাশি অবৈধ গাছ কাটা, দখলদারি ও অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।
বন উজাড় ও সরকারি কঠোরতা
সুমাত্রা দ্বীপ খনিজ ও তেলপাম চাষের জন্যও পরিচিত। তবে দ্রুত বিনিয়োগের চাপে গত এক দশকে ব্যাপক বন উজাড় হয়েছে। পরিবেশ সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার ষোল থেকে দুই হাজার পঁচিশ সালের মধ্যে আচেহ ও উত্তর সুমাত্রায় প্রায় চৌদ্দ লাখ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর অতিরিক্ত গাছ কাটার অভিযোগে সরকার অন্তত দশটি সম্পদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
কার্বন বাণিজ্যের দিকেও নজর
বনাঞ্চলের কার্বন শোষণ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্যে প্রবেশের সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে মারুবেনি। ওয়াতানাবের ভাষায়, পরিবেশ সুরক্ষা শুধু নৈতিক দায় নয়, এটি ব্যবসার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিশ্চিত করতেও সহায়ক।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















