০৬:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
মিয়ানমারের জঙ্গলে পরিত্যক্ত প্রতারণার নগরী, বিশ্বজুড়ে শিকারিদের কারখানার ভেতরের গল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি লাইকেই আলোচনায় এএসপা সদস্য নিংনিং ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ছাড়ের পথে দিল্লি, মালিকানার নিয়মে আসছে আমূল পরিবর্তন পুনর্ব্যবহৃত উপকরণে ব্রিটেনে বিরল খনিজ চুম্বকের নতুন যুগ, চীনের আধিপত্য ভাঙতে মাঠে নামল মক্যাঙ্গো তাইওয়ান–যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক সমঝোতা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কৌশলগত অংশীদার হতে চায় তাইপে ভেনেজুয়েলায় ধীরে ধীরে বন্দিমুক্তি, অনিশ্চয়তার মাঝেও অপেক্ষা পরিবারগুলোর খরচ কমাতে বিদেশি বিনিয়োগে নতুন নিষ্পত্তি ব্যবস্থার প্রস্তাব ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রকের হাদির হত্যার বিচার দাবিতে রাজপথে ইনকিলাব মঞ্চ, আদালতের নতুন তদন্ত নির্দেশ শুল্ক কমিয়ে নতুন পথে কানাডা-চীন বাণিজ্য, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ক্যানোলা ঘিরে সম্পর্ক পুনর্গঠন উত্তরার আবাসিক ভবনে আগুনে ছয় জনের মৃত্যু, একই পরিবারের তিনজন

মিয়ানমারের জঙ্গলে পরিত্যক্ত প্রতারণার নগরী, বিশ্বজুড়ে শিকারিদের কারখানার ভেতরের গল্প

মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের ঘন জঙ্গলে গড়ে ওঠা এক সময়ের বিশাল প্রতারণা কেন্দ্র এখন নীরব ও পরিত্যক্ত। যুদ্ধবিধ্বস্ত সীমান্তভূমিতে চীনা অপরাধচক্রের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই কম্পাউন্ড থেকে বিশ্বের নানা দেশের মানুষকে অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো। বিদ্রোহী বাহিনীর দখলে পড়ার পর সেই কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলেও রেখে গেছে ভয়াবহ এক অপরাধ অর্থনীতির চিহ্ন।

জঙ্গলের ভেতর দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রতারণা সাম্রাজ্য

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তের নির্জন এলাকায় গড়ে উঠেছিল বিশাল অফিস পার্ক। সারি সারি কম্পিউটার মনিটর, দেয়ালে ঝুলে থাকা প্রেরণাদায়ক স্লোগান, সাজানো বোর্ডরুম, ভুয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আদলে তৈরি কক্ষ—সব মিলিয়ে এটি যেন আধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানির ছায়া। কিন্তু বাস্তবে এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষকে লক্ষ করে চালানো হতো দীর্ঘমেয়াদি অনলাইন প্রতারণা।

হাজারো শ্রমিক, অনেকেই জোরপূর্বক আটক

শুন্দা পার্ক নামে পরিচিত এই প্রতারণা কেন্দ্রটি চালু হয়েছিল দুই হাজার চব্বিশ সালে। প্রায় ত্রিশটি দেশের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ সেখানে কাজ করতেন। কেউ কেউ প্রতারণার কাজে স্বেচ্ছায় যুক্ত হলেও অনেকেই ছিলেন অপহৃত ও জোরপূর্বক আটকে রাখা শ্রমিক। দিনের পর দিন বারো ঘণ্টার শিফটে কাজ, শারীরিক নির্যাতন আর অবিরাম মানসিক চাপে কাটত তাদের জীবন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অচেনা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানোই ছিল প্রধান কৌশল।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও বৈশ্বিক ক্ষতি

এই প্রতারণা চক্র কেবল সহজ-সরল মানুষকে নয়, প্রযুক্তি-সচেতন নানা শ্রেণির মানুষকেও নিশানা করত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভুয়া ভিডিও, জাল আর্থিক অ্যাপ ব্যবহার করে তৈরি করা হতো বিশ্বাসযোগ্য ফাঁদ। যুক্তরাষ্ট্রেই দুই হাজার চব্বিশ সালে এমন প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত এক হাজার কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি হিসাব। প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ অনেক ভুক্তভোগী লজ্জায় অভিযোগই করেন না।

বিদ্রোহী দখল ও যুদ্ধের ছায়া

গত বছরের নভেম্বর মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতে থাকা কারেন বিদ্রোহী বাহিনী হঠাৎ করেই শুন্দা পার্ক দখল করে। সেই সময় এলাকা জুড়ে চলছিল গোলাবর্ষণ, মর্টারের শব্দে কেঁপে উঠছিল চারপাশ। বিদ্রোহীরা প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করলেও যুদ্ধের তীব্রতার কারণে অধিকাংশ শ্রমিক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক প্রমাণ আগুনে পুড়ে যায়, ফেলে যাওয়া থাকে হাজার হাজার মোবাইল ফোন, সিমকার্ড আর ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ।

নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি

সেখান থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন শ্রমিক শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে জানান, সামান্য লক্ষ্য পূরণ না হলেই চলত মারধর। খাবার বন্ধ রাখা, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা ছিল সাধারণ শাস্তি। কেউ কেউ বলেন, তারা ভেবেছিলেন ভালো বেতনের চাকরি করতে যাচ্ছেন, বাস্তবে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার করিয়ে এনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এই প্রতারণা কারখানায়।

অপরাধ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের দুর্বলতা

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ধরনের প্রতারণা কেন্দ্রগুলো এখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক অপরাধ ব্যবসার অংশ। এই অর্থ কেবল অপরাধচক্র নয়, অঞ্চলটির প্রভাবশালী মহলের হাতেও পৌঁছায়। মিয়ানমারের সামরিক শাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা অনেকাংশে দেখনদারিতে সীমাবদ্ধ। সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা এই অপরাধ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

বন্ধ হলেও শেষ নয়

শুন্দা পার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও প্রতারণা থেমে নেই। সীমান্তের অন্য গ্রামগুলোতে নতুন করে গড়ে উঠছে আরও কেন্দ্র। কিছু শ্রমিক নিরাপদে দেশে ফিরলেও অনেকে আবার অন্য প্রতারণা ঘাঁটিতে চলে গেছে। পরিত্যক্ত এই কম্পাউন্ড তাই শুধু একটি স্থানের গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক অনলাইন প্রতারণার এক নির্মম বাস্তবতার প্রতীক।

জনপ্রিয় সংবাদ

মিয়ানমারের জঙ্গলে পরিত্যক্ত প্রতারণার নগরী, বিশ্বজুড়ে শিকারিদের কারখানার ভেতরের গল্প

মিয়ানমারের জঙ্গলে পরিত্যক্ত প্রতারণার নগরী, বিশ্বজুড়ে শিকারিদের কারখানার ভেতরের গল্প

০৪:০০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের ঘন জঙ্গলে গড়ে ওঠা এক সময়ের বিশাল প্রতারণা কেন্দ্র এখন নীরব ও পরিত্যক্ত। যুদ্ধবিধ্বস্ত সীমান্তভূমিতে চীনা অপরাধচক্রের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই কম্পাউন্ড থেকে বিশ্বের নানা দেশের মানুষকে অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হতো। বিদ্রোহী বাহিনীর দখলে পড়ার পর সেই কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলেও রেখে গেছে ভয়াবহ এক অপরাধ অর্থনীতির চিহ্ন।

জঙ্গলের ভেতর দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রতারণা সাম্রাজ্য

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তের নির্জন এলাকায় গড়ে উঠেছিল বিশাল অফিস পার্ক। সারি সারি কম্পিউটার মনিটর, দেয়ালে ঝুলে থাকা প্রেরণাদায়ক স্লোগান, সাজানো বোর্ডরুম, ভুয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আদলে তৈরি কক্ষ—সব মিলিয়ে এটি যেন আধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানির ছায়া। কিন্তু বাস্তবে এখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষকে লক্ষ করে চালানো হতো দীর্ঘমেয়াদি অনলাইন প্রতারণা।

হাজারো শ্রমিক, অনেকেই জোরপূর্বক আটক

শুন্দা পার্ক নামে পরিচিত এই প্রতারণা কেন্দ্রটি চালু হয়েছিল দুই হাজার চব্বিশ সালে। প্রায় ত্রিশটি দেশের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ সেখানে কাজ করতেন। কেউ কেউ প্রতারণার কাজে স্বেচ্ছায় যুক্ত হলেও অনেকেই ছিলেন অপহৃত ও জোরপূর্বক আটকে রাখা শ্রমিক। দিনের পর দিন বারো ঘণ্টার শিফটে কাজ, শারীরিক নির্যাতন আর অবিরাম মানসিক চাপে কাটত তাদের জীবন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অচেনা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানোই ছিল প্রধান কৌশল।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও বৈশ্বিক ক্ষতি

এই প্রতারণা চক্র কেবল সহজ-সরল মানুষকে নয়, প্রযুক্তি-সচেতন নানা শ্রেণির মানুষকেও নিশানা করত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভুয়া ভিডিও, জাল আর্থিক অ্যাপ ব্যবহার করে তৈরি করা হতো বিশ্বাসযোগ্য ফাঁদ। যুক্তরাষ্ট্রেই দুই হাজার চব্বিশ সালে এমন প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত এক হাজার কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি হিসাব। প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে, কারণ অনেক ভুক্তভোগী লজ্জায় অভিযোগই করেন না।

বিদ্রোহী দখল ও যুদ্ধের ছায়া

গত বছরের নভেম্বর মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতে থাকা কারেন বিদ্রোহী বাহিনী হঠাৎ করেই শুন্দা পার্ক দখল করে। সেই সময় এলাকা জুড়ে চলছিল গোলাবর্ষণ, মর্টারের শব্দে কেঁপে উঠছিল চারপাশ। বিদ্রোহীরা প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করলেও যুদ্ধের তীব্রতার কারণে অধিকাংশ শ্রমিক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক প্রমাণ আগুনে পুড়ে যায়, ফেলে যাওয়া থাকে হাজার হাজার মোবাইল ফোন, সিমকার্ড আর ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ।

নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি

সেখান থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন শ্রমিক শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে জানান, সামান্য লক্ষ্য পূরণ না হলেই চলত মারধর। খাবার বন্ধ রাখা, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা ছিল সাধারণ শাস্তি। কেউ কেউ বলেন, তারা ভেবেছিলেন ভালো বেতনের চাকরি করতে যাচ্ছেন, বাস্তবে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার করিয়ে এনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এই প্রতারণা কারখানায়।

অপরাধ অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের দুর্বলতা

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ধরনের প্রতারণা কেন্দ্রগুলো এখন বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক অপরাধ ব্যবসার অংশ। এই অর্থ কেবল অপরাধচক্র নয়, অঞ্চলটির প্রভাবশালী মহলের হাতেও পৌঁছায়। মিয়ানমারের সামরিক শাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা অনেকাংশে দেখনদারিতে সীমাবদ্ধ। সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা এই অপরাধ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে।

বন্ধ হলেও শেষ নয়

শুন্দা পার্ক বন্ধ হয়ে গেলেও প্রতারণা থেমে নেই। সীমান্তের অন্য গ্রামগুলোতে নতুন করে গড়ে উঠছে আরও কেন্দ্র। কিছু শ্রমিক নিরাপদে দেশে ফিরলেও অনেকে আবার অন্য প্রতারণা ঘাঁটিতে চলে গেছে। পরিত্যক্ত এই কম্পাউন্ড তাই শুধু একটি স্থানের গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক অনলাইন প্রতারণার এক নির্মম বাস্তবতার প্রতীক।