০৮:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানে রক্তাক্ত বিদ্রোহ, ক্ষমতার শেষ অধ্যায় নাকি আরও অন্ধকার ভবিষ্যৎ

ইরানের বাজার ও রাজপথে যখন হাজারো মানুষ নেমে এসেছিল শাসকের বিরুদ্ধে, তখন তাদের জবাব এসেছিল গুলিতে। টানা দুই সপ্তাহ ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগানে উত্তাল থাকা শহরগুলো হঠাৎই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। বিপ্লবী গার্ডদের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে হামলে পড়ে। ছাদে ছাদে বসানো স্নাইপাররা গুলি চালায় নিজ দেশের মানুষের ওপর। লক্ষ্য ছিল মুখ ও শরীরের সংবেদনশীল অংশ। মর্গে জায়গা নেই, রক্তাক্ত ফুটপাতে সারি সারি মরদেহ। বস্তাবন্দী লাশের স্তূপই বলে দিচ্ছে, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আহতদের অনেককেই হাসপাতাল থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কারাগারে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ অজানা।

এই সময়টাই হওয়ার কথা ছিল চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ধর্মতান্ত্রিক শাসনের ইতি টানার মুহূর্ত। সাহসী এই জনগণ একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ ইরানের যোগ্য। বিশ্বও উপকৃত হতো, যদি মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা ছড়ানো ও পারমাণবিক হুমকি হয়ে থাকা দেশটি রূপ নিত স্থিতিশীল ও সহনশীল রাষ্ট্রে। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে না। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ কি আদৌ এই শাসনের অবসান ঘটাতে পারবে, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল হবে—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

Iran protests: Trump says help 'on its way' as Iranian official says 2,000  killed | Reuters

দুর্বলতাই নিষ্ঠুরতার মূল কারণ

ইরানের শাসকেরা আজ নির্মম, কারণ তারা দুর্বল। জনগণকে দেওয়ার মতো কিছু নেই, আছে শুধু সহিংসতা। দেশের ভেতরে অর্থনীতি সংকুচিত, খাদ্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া, কর্মসংস্থান কমছে, দারিদ্র্য বাড়ছে। দেশের বাইরে পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর। লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছরে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে স্পষ্ট হয়েছে, শাসনব্যবস্থা নিজের শীর্ষ কমান্ডার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রক্ষা করতে পারছে না। অতীতে প্রতিবাদ দমনের পর কখনো কখনো ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যেমন নারীদের পোশাকবিধিতে শিথিলতা। এবার মাসে নামমাত্র ভাতা ঘোষণায় ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা হয়েছিল, যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভবিষ্যতের অজানা মোড়

আসন্ন দিনগুলো অনিশ্চয়তা ও ভয়েই ঘেরা। আপাতত বিক্ষোভকারীরা রাজপথ ছেড়েছে, তবে কতদিনের জন্য তা কেউ জানে না। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হবে, যদি শাসন টিকে যায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, আর জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী দমনের মধ্যে ঠেলে দেয়। আরেকটি শঙ্কা, দেশটি আরও বড় সহিংসতায় ডুবে যেতে পারে। অতীতের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসান ঘটাতে গিয়ে কীভাবে ব্যাপক রক্তপাত হয়। জাতিগত বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিলে ইরান বিশৃঙ্খলার খাদে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হলে পারমাণবিক উপাদান ও চরমপন্থার ঝুঁকি, পরিস্থিতি হয়ে উঠবে আরও ভয়ংকর। ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আশঙ্কাই হয়তো অনেককে এখনো পথে নামতে বাধা দিচ্ছে।

Iran's Islamic Republic Might Soon Collapse Like Syria's

ভাঙনের সম্ভাব্য চিত্র

মাঝামাঝি কিছু পরিস্থিতিও কল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে পারে। বিপ্লবী গার্ডের ভেতরের কোনো অংশ হয়তো সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেবে। আবার জনগণের নামে ক্ষমতা দখল করে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমা মেনে নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ঝুঁকি

ওয়াশিংটনের জন্য এটি বহু দশকের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে শক্ত পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে আবার পিছু হটেছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণ হলে তা সীমিত পরিসরেই হতে পারে। নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা কিংবা নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় হামলা—সব পথেই রয়েছে বড় ঝুঁকি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্ব সরলেও, রক্তাক্ত অতীত ভুলে স্থিতিশীল সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।

Will Iran's Protests, Economic Crisis Finally Topple the Government?

নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা

এই সংকটের প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে পুরোনো নিয়ম ভেঙে পড়ছে। বড় শক্তিগুলোর হিসাব বদলাচ্ছে, আর প্রতিটি হস্তক্ষেপ নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। একসময় মনে করা হতো, গণঅভ্যুত্থান মানেই গণতন্ত্রের জন্ম। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবু আশা একটাই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শাসনের পতন হলে তা সাহসী ইরানি জনগণের পক্ষেই যাবে, যারা বারবার প্রমাণ করেছে—তারাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে রক্তাক্ত বিদ্রোহ, ক্ষমতার শেষ অধ্যায় নাকি আরও অন্ধকার ভবিষ্যৎ

০৬:৩০:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ইরানের বাজার ও রাজপথে যখন হাজারো মানুষ নেমে এসেছিল শাসকের বিরুদ্ধে, তখন তাদের জবাব এসেছিল গুলিতে। টানা দুই সপ্তাহ ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগানে উত্তাল থাকা শহরগুলো হঠাৎই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। বিপ্লবী গার্ডদের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে হামলে পড়ে। ছাদে ছাদে বসানো স্নাইপাররা গুলি চালায় নিজ দেশের মানুষের ওপর। লক্ষ্য ছিল মুখ ও শরীরের সংবেদনশীল অংশ। মর্গে জায়গা নেই, রক্তাক্ত ফুটপাতে সারি সারি মরদেহ। বস্তাবন্দী লাশের স্তূপই বলে দিচ্ছে, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আহতদের অনেককেই হাসপাতাল থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কারাগারে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎ অজানা।

এই সময়টাই হওয়ার কথা ছিল চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ধর্মতান্ত্রিক শাসনের ইতি টানার মুহূর্ত। সাহসী এই জনগণ একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ ইরানের যোগ্য। বিশ্বও উপকৃত হতো, যদি মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা ছড়ানো ও পারমাণবিক হুমকি হয়ে থাকা দেশটি রূপ নিত স্থিতিশীল ও সহনশীল রাষ্ট্রে। কিন্তু শুধু প্রতিবাদ দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে না। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ কি আদৌ এই শাসনের অবসান ঘটাতে পারবে, নাকি পরিস্থিতি আরও জটিল হবে—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

Iran protests: Trump says help 'on its way' as Iranian official says 2,000  killed | Reuters

দুর্বলতাই নিষ্ঠুরতার মূল কারণ

ইরানের শাসকেরা আজ নির্মম, কারণ তারা দুর্বল। জনগণকে দেওয়ার মতো কিছু নেই, আছে শুধু সহিংসতা। দেশের ভেতরে অর্থনীতি সংকুচিত, খাদ্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া, কর্মসংস্থান কমছে, দারিদ্র্য বাড়ছে। দেশের বাইরে পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর। লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছরে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধে স্পষ্ট হয়েছে, শাসনব্যবস্থা নিজের শীর্ষ কমান্ডার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রক্ষা করতে পারছে না। অতীতে প্রতিবাদ দমনের পর কখনো কখনো ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যেমন নারীদের পোশাকবিধিতে শিথিলতা। এবার মাসে নামমাত্র ভাতা ঘোষণায় ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা হয়েছিল, যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভবিষ্যতের অজানা মোড়

আসন্ন দিনগুলো অনিশ্চয়তা ও ভয়েই ঘেরা। আপাতত বিক্ষোভকারীরা রাজপথ ছেড়েছে, তবে কতদিনের জন্য তা কেউ জানে না। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হবে, যদি শাসন টিকে যায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে, আর জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী দমনের মধ্যে ঠেলে দেয়। আরেকটি শঙ্কা, দেশটি আরও বড় সহিংসতায় ডুবে যেতে পারে। অতীতের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের অবসান ঘটাতে গিয়ে কীভাবে ব্যাপক রক্তপাত হয়। জাতিগত বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিলে ইরান বিশৃঙ্খলার খাদে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হলে পারমাণবিক উপাদান ও চরমপন্থার ঝুঁকি, পরিস্থিতি হয়ে উঠবে আরও ভয়ংকর। ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আশঙ্কাই হয়তো অনেককে এখনো পথে নামতে বাধা দিচ্ছে।

Iran's Islamic Republic Might Soon Collapse Like Syria's

ভাঙনের সম্ভাব্য চিত্র

মাঝামাঝি কিছু পরিস্থিতিও কল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে পারে। বিপ্লবী গার্ডের ভেতরের কোনো অংশ হয়তো সর্বোচ্চ নেতাকে সরিয়ে দেবে। আবার জনগণের নামে ক্ষমতা দখল করে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত সেনাবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক সমঝোতার পথে হাঁটতে পারে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমা মেনে নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ঝুঁকি

ওয়াশিংটনের জন্য এটি বহু দশকের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে শক্ত পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে আবার পিছু হটেছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণ হলে তা সীমিত পরিসরেই হতে পারে। নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা কিংবা নির্দিষ্ট সামরিক স্থাপনায় হামলা—সব পথেই রয়েছে বড় ঝুঁকি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্ব সরলেও, রক্তাক্ত অতীত ভুলে স্থিতিশীল সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।

Will Iran's Protests, Economic Crisis Finally Topple the Government?

নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা

এই সংকটের প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব রাজনীতিতে পুরোনো নিয়ম ভেঙে পড়ছে। বড় শক্তিগুলোর হিসাব বদলাচ্ছে, আর প্রতিটি হস্তক্ষেপ নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। একসময় মনে করা হতো, গণঅভ্যুত্থান মানেই গণতন্ত্রের জন্ম। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবু আশা একটাই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শাসনের পতন হলে তা সাহসী ইরানি জনগণের পক্ষেই যাবে, যারা বারবার প্রমাণ করেছে—তারাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।