এক দশক আগে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বলেছিলেন, চীনকে তিনি একটি মহাকাশ শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চান। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে অনেক আগেই। মঙ্গলে রোভার পাঠানো হয়েছে, পৃথিবীর কক্ষপথে চালু রয়েছে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন। এবার আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে চীনের বেসরকারি মহাকাশ শিল্প। প্রথমবারের মতো রকেটের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ধাপ সফলভাবে ফেরত আনার দৌড়ে নামছে তারা, যা উৎক্ষেপণ খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
বেসরকারি মহাকাশে চীনের নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষা
চীনের বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আধুনিক স্যাটেলাইট কারখানা এবং সরকারি সহায়তা একসঙ্গে শিল্পটিকে গতি দিচ্ছে। সরকারের নতুন বিভাগ বাণিজ্যিক মহাকাশ খাতে আরও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ঢালার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর লক্ষ্য একটাই, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যে থাকা বৈশ্বিক মহাকাশ বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা।
তবে বাস্তবতা হলো, এখনো চীন অনেক পিছিয়ে। প্রায় ছয়শ বেসরকারি মহাকাশ প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্সের মতো বিশাল নয়। তবু কিছু উদ্যোক্তা সামনে আসছেন। সাবেক আর্থিক বিশ্লেষক ঝাং ছাংউ প্রতিষ্ঠা করেছেন ল্যান্ড স্পেস, আর প্রকৌশলী কাং ইয়ংলাই গড়েছেন স্পেস পাইওনিয়ার। দুই প্রতিষ্ঠানই রকেট উৎক্ষেপণের দৌড়ে পরিচিত নাম হয়ে উঠছে।

সংখ্যার হিসাবে চীনের সীমাবদ্ধতা
দুই হাজার পঁচিশ সালে চীন প্রায় একশ কক্ষপথ উৎক্ষেপণ চালালেও এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবদান ছিল মাত্র ষোলটি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছিল প্রায় একশ আশিটি উৎক্ষেপণ, যার মধ্যে একশ ষাটটিরও বেশি করেছে স্পেসএক্স একাই। এই ব্যবধানই দেখিয়ে দেয়, চীনের সামনে পথ কতটা দীর্ঘ।
তবু বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়ছে। এক দশকে এই খাতের আকার তিনশ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ছয়শ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং দুই হাজার পঁয়ত্রিশ সালের মধ্যে তা তিন গুণ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এই বিশাল বাজারে আধিপত্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও চীন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত নির্ভরতা ও খরচের চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে চীনের অধিকাংশ উৎক্ষেপণ নির্ভর করে রাষ্ট্রায়ত্ত চীনা মহাকাশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি করপোরেশনের তৈরি লং মার্চ রকেটের ওপর। এগুলো নির্ভরযোগ্য হলেও বেসামরিক ও সামরিক কর্মসূচির চাপের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহও কম, ফলে খরচ কমানোর তাগিদ ততটা নেই।

এক কেজি মাল নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে পাঠাতে চীনে গড়ে প্রায় ষাট হাজার ইউয়ান খরচ হয়। একই কাজ স্পেসএক্সের ফ্যালকন নাইন রকেট করে প্রায় এক তৃতীয়াংশ খরচে। এর মূল কারণ রকেটের পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, যেখানে ব্যবহৃত বুস্টার ফিরিয়ে এনে আবার ব্যবহার করা যায়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মূলত একবার ব্যবহারযোগ্য রকেটের ওপর নির্ভরশীল।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটে পরীক্ষার যুগ
এই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ল্যান্ডস্পেস আলাদাভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট পরীক্ষা চালায়। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই বুস্টার ধাপ ফেরত আনার আগে বিস্ফোরণ ঘটে, তবু দ্বিতীয় ধাপ সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছায়। দুই হাজার ছাব্বিশ সালে স্পেস পাইওনিয়ার তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য তিয়ানলং রকেট পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও একই পথে হাঁটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রকেট নির্মাণ এখনো অত্যন্ত জটিল কাজ।
স্যাটেলাইটের মহাযজ্ঞ ও চাহিদার প্রশ্ন
সস্তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট সফল হলে চীন দ্রুত নিম্ন কক্ষপথে বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারবে। বৈশ্বিক ইন্টারনেট সেবা দিতে প্রয়োজন তথাকথিত মেগা নক্ষত্রমালা। চীনের দুটি বড় প্রকল্প রয়েছে, একটি গোওয়াং, অন্যটি হাজার পাল। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমটিতে থাকবে তেরো হাজার স্যাটেলাইট, দ্বিতীয়টিতে পনেরো হাজার। এখনো দুটির স্যাটেলাইট সংখ্যা শতকের কাছাকাছি।
কিন্তু এত স্যাটেলাইটের সেবার গ্রাহক পাওয়া সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল ইন্টারনেটের কারণে স্যাটেলাইট সেবার চাহিদা বেশি। চীনে পরিস্থিতি ভিন্ন। শহর ও গ্রামে তুলনামূলক সস্তা ও দ্রুত ইন্টারনেট ইতোমধ্যেই রয়েছে। দূরবর্তী এলাকার মানুষদের জন্য স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যয়বহুল। আবার পশ্চিমা দেশগুলো চীনা স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছে।

তবু নতুন চাহিদার ইঙ্গিত
চাহিদা বাড়ার কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাস হাজার পাল প্রকল্পের সঙ্গে উড়োজাহাজে ইন্টারনেট সেবার চুক্তি করেছে। চীনের বড় গাড়ি নির্মাতা জেলি তাদের গাড়ির নেভিগেশনের জন্য নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ছে। হুয়াওয়ে ও শাওমি স্মার্টফোনে স্যাটেলাইট কল সুবিধা যুক্ত করেছে।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও সামরিক প্রভাব
চীন শুধু বাণিজ্যিক সেবায় সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। মহাকাশ পর্যটন কিংবা মহাকাশ ভিত্তিক জৈব উৎপাদনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতেও নজর দিচ্ছে তারা। সম্প্রতি এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে মহাকাশে জীবাণু ও উদ্ভিদ পাঠিয়েছে।
তবে চীনা সরকার কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একক ক্ষমতাধর হতে দেবে না। তবুও বেসরকারি খাতকে সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। নতুন নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ব্যবহারের সুযোগ ও জাতীয় তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রযুক্তিগুলোর সামরিক ব্যবহারও রয়েছে। যোগাযোগ, নজরদারি কিংবা শত্রু স্যাটেলাইট অপসারণে এসব সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই চীনের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের উত্থান শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ রাজনৈতিক প্রভাবও ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















