বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একসময় গবেষণায় শীর্ষে থাকা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সূচকে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। একই সময়ে দ্রুত উত্থান ঘটছে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর, যাদের গবেষণা উৎপাদন ও প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে।
গবেষণা সূচকে হার্ভার্ডের অবস্থান বদল
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে উৎপাদনশীল গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল হার্ভার্ড। বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও উদ্ধৃতির ভিত্তিতে তৈরি একটি আন্তর্জাতিক সূচকে প্রতিষ্ঠানটি এক নম্বরে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, হার্ভার্ড এখন তিন নম্বরে। শীর্ষস্থান দখল করেছে চীনের ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, শীর্ষ দশে থাকা বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় অংশই এখন চীনের।

এই পরিবর্তনকে অনেক বিশেষজ্ঞ বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি সূচকের ওঠানামা নয়, বরং গবেষণা ক্ষমতার বিশ্বব্যাপী পুনর্বিন্যাস।
চীনের বিনিয়োগে গবেষণার বিস্ফোরণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। গত দুই দশকে চীন তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলেছে। এর ফল হিসেবে গবেষণার পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।

নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা সূচকে দেখা যায়, শীর্ষ দশে এখন সাতটির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনকি বিকল্প আরেকটি সূচকেও একই প্রবণতা স্পষ্ট, যেখানে শীর্ষস্থান ছাড়া পরবর্তী প্রায় সব অবস্থানই চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দখলে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণায় চাপ
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণা তহবিলে কাটছাঁট, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসন নীতির কঠোরতার কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সংখ্যা কমেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আগমন প্রায় এক পঞ্চমাংশ কমে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় নেতারা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে গবেষণার গতি ব্যাহত হবে এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। যদিও হার্ভার্ডসহ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও গবেষণার মানে এগিয়ে, তবু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলো অনেক দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত
শিক্ষাবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খারাপ হয়ে যাচ্ছে এমন নয়। বরং চীনসহ অন্যান্য দেশ গবেষণা সক্ষমতা বাড়াতে যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। চীন এখন শুধু গবেষণার পরিমাণ নয়, আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধৃত গবেষণার দিক থেকেও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

চীনের নেতৃত্ব একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছে, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একটি দেশের বৈশ্বিক ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় এই বিপুল বিনিয়োগ।
বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় সূচকের প্রভাব
বিশ্ববিদ্যালয় সূচক শুধু মর্যাদার প্রশ্ন নয়। শিক্ষার্থীরা কোথায় পড়তে যাবে, গবেষকরা কোথায় কাজ করবে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়নের সিদ্ধান্তেও এসব সূচকের প্রভাব পড়ে। ফলে শীর্ষস্থান ধরে রাখা বা হারানো একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক শক্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে এক নতুন বাস্তবতার দিকে, যেখানে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় বৈশ্বিক নেতৃত্ব আর একক কোনো দেশের হাতে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















