মেটাবলিক স্বাস্থ্য—শব্দটি এখন স্বাস্থ্যচর্চার আলোচনায় প্রায় সর্বত্র। দীর্ঘায়ু, সুস্থ জীবন ও রোগমুক্ত থাকার সঙ্গে এই শব্দটি বারবার জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মেটাবলিক স্বাস্থ্য আসলে কী, আর এটি খারাপ হলে শরীরে কী ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে—সে প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই এখনও স্পষ্ট নয়।
মেটাবলিক স্বাস্থ্য বলতে কী বোঝায়
মেটাবলিক স্বাস্থ্য মূলত শরীরের শক্তি ব্যবহার ও সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তার একটি সামগ্রিক চিত্র। চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি সাধারণত মেটাবলিক সিনড্রোম না থাকার অবস্থাকেই বোঝায়। মেটাবলিক সিনড্রোম ধরা হয় তখনই, যখন একসঙ্গে অন্তত তিনটি সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমা, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া, ভালো কোলেস্টেরল কমে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকা। এসব সমস্যাই হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বেশিরভাগ মানুষই ঝুঁকির ভেতরে
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বিপুল সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পুরোপুরি সুস্থ মেটাবলিক অবস্থায় নেই। হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও বিপাকজনিত সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। স্থূলতা, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ ও হৃদ্রোগ একসঙ্গে শরীরের ভেতরে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি করে।
অতিরিক্ত চর্বিই মূল সমস্যা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমাই মেটাবলিক সমস্যার বড় কারণ। বিশেষ করে পেটের ভেতরের চর্বি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। শরীরে চর্বি জমা হয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। কিন্তু যখন দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা হয়, তখন সেই চর্বি শরীরের এমন জায়গায় জমতে শুরু করে, যেখানে তার থাকার কথা নয়। লিভার ও পেশিতে চর্বি জমে প্রদাহ তৈরি হয়, ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে, আর সেটিই আবার স্থূলতাকে আরও জটিল করে তোলে।

শরীরের গঠনও ঝুঁকি বাড়ায়
শুধু খাওয়া-দাওয়া বা ব্যায়ামের অভাবই নয়, জিনগত কারণও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। যাদের শরীরের গঠন আপেলের মতো, অর্থাৎ পেটের দিকে চর্বি বেশি জমে, তাদের মেটাবলিক সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। উরু ও নিতম্বে চর্বি জমা হলে সেই ঝুঁকি কিছুটা কম থাকে। কারণ ত্বকের নিচের চর্বি ও ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চারপাশের চর্বি শরীরে ভিন্নভাবে কাজ করে এবং প্রদাহের মাত্রাও আলাদা হয়।
অন্য সমস্যার আগাম সংকেত
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত চর্বি শরীরের জন্য গাড়ির ড্যাশবোর্ডে জ্বলে ওঠা সতর্ক বাতির মতো। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ভেতরে আরও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ওজন বেড়ে গেলে কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। শুরুতে কারও ক্ষেত্রে শুধু রক্তচাপ বাড়তে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে আগে ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল সমস্যা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাগুলো একটির পর একটি যুক্ত হতে থাকে।
সময়ের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি
একটি পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। রক্তচাপ বা শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। চিকিৎসকদের মতে, ভুল পথে এগোচ্ছে এমন যে কোনো পরিবর্তন ভবিষ্যতের বড় সমস্যার পূর্বাভাস হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি
মেটাবলিক সমস্যাগুলো সময়ের সঙ্গে শরীরের ভেতরে ব্যাপক ক্ষতি করে। উচ্চ রক্তচাপ ধমনিকে শক্ত করে তোলে, প্লাক জমে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ডায়াবেটিস কিডনির ছাঁকনি নষ্ট করে, রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। লিভারে চর্বি জমে প্রদাহ ও স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। স্তন, কোলন, জরায়ু, লিভার ও অগ্ন্যাশয়সহ একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকিও স্থূলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেটাবলিক সমস্যার সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো শুরুতেই প্রতিরোধ। স্বাস্থ্যকর ওজনে ফিরে আসা এখানে প্রথম ধাপ। ধূমপান ছাড়ার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে বলেন চিকিৎসকেরা। নিয়মিত শরীরচর্চা, হৃদ্বান্ধব খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম—এসবই দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। ঘরে রান্না করা খাবার খেলে লবণ ও ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। ব্যায়াম শুধু ওজন কমায় না, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সও কমায়।
তবে অনেক ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসায় ওজন কমাতে সহায়ক নতুন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করে স্থূলতা ও এর জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, একেবারে শুরুর দিকেই ব্যবস্থা নিলে রোগের গতি থামানো বা উল্টো দিকে ফেরানো সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















