দুবাইয়ে চালু হওয়া এক অভিনব আত্মপ্রতিকৃতি স্টুডিও পেশাদার আলোকচিত্রের ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এখানে কোনো আলোকচিত্রী নেই, নেই ক্যামেরার সামনে অস্বস্তিকর নির্দেশনা। পুরো অভিজ্ঞতাটি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের ছবি তুলছেন সম্পূর্ণ গোপনীয় ও স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশে।
নতুন ধারণার স্টুডিওতে প্রথম অভিজ্ঞতা
দুবাইয়ের এই নতুন স্টুডিওতে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই পরিবেশটি আলাদা মনে হয়। এটি কোনো প্রচলিত আলোকচিত্র কেন্দ্রের মতো নয়, বরং ব্যক্তিগত একান্ত একটি জায়গা। অতিথিদের ধারণাটি বুঝিয়ে দেওয়া হয় সহজভাবে, যাতে শুরু থেকেই তারা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। বর্তমানে তিনটি আলাদা কক্ষ রয়েছে, প্রতিটি নকশা করা হয়েছে গোপনীয়তা ও আরামের কথা মাথায় রেখে। একটি কালো থিমের কক্ষ বেছে নেওয়ার পর সেটি যেন ব্যক্তিগত আশ্রয়ের মতোই মনে হয়।
ভেতরে রয়েছে সাজগোজের টেবিল, চুল ও মেকআপ ঠিক করার সব সরঞ্জাম, পোশাক বদলের হ্যাঙ্গার, নানা ধরনের চেয়ার ও উপকরণ। সবকিছু সাজানো এমনভাবে, যাতে ছবি তোলার সময় কল্পনা ও স্বতঃস্ফূর্ততা কাজ করে।

আড়ালে ক্যামেরা, সামনে নিজের প্রতিবিম্ব
এই স্টুডিওর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। বড় আয়নার আড়ালে লুকানো ক্যামেরা, ফলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকার চাপ নেই। আয়নার পাশেই একটি পর্দায় সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ওঠে তোলা ছবি। হাতে থাকে ছোট একটি রিমোট, একটি বোতাম চাপলেই ছবি তোলা যায়। প্রয়োজনে সহায়তার জন্য আরেকটি রিমোটও রাখা থাকে, যাতে কক্ষ ছাড়তে না হয়।
শুরুর দিকে পরিচিত ভঙ্গিমা আর অভ্যাস করা অভিব্যক্তিই আসে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ধীরে ধীরে বদলে যায় অনুভূতি। সামনে কেউ নেই, বিচার করার কেউ নেই, কোনো নির্দেশও নেই। ফলে মন থেকে ঝরে পড়ে অস্বস্তি। মানুষ তখন শুধু বোতাম চাপা আর ভিন্ন ভঙ্গি পরীক্ষা করার আনন্দে মেতে ওঠে।
স্বস্তি থেকেই আসে আসল ছবি
পর্দায় যখন তোলা ছবিগুলো দেখা যায়, তখনই চমক। সবচেয়ে ভালো ছবিগুলো এসেছে সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন মুখে ছিল স্বাভাবিক ভাব, শরীরে ছিল নির্ভার ভঙ্গি। এই স্টুডিওর উদ্যোক্তারা জানান, তাদের বিশ্বাস খুব সহজ—মানুষ যখন নিজেকে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণে অনুভব করে, তখনই সে স্বাভাবিক হয়, আর সেই স্বাভাবিকতাই ছবিকে শক্তিশালী করে তোলে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এই ধারণার গুরুত্ব আরও বেশি। এখানে গোপনীয়তা শুধু পছন্দের বিষয় নয়, অনেকের জন্য এটি প্রয়োজন। বিশেষ করে অনেক মুসলিম নারী প্রচলিত আলোকচিত্রে অংশ নিতে দ্বিধায় থাকেন। এই স্টুডিও সেই বাধা দূর করছে।
গোপনীয়তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়
এই উদ্যোগ শুধু একটি স্টুডিও নয়, এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান। সফটওয়্যার ও অভিজ্ঞতা দুটিই নিয়মিত উন্নত করা হচ্ছে। সেশন শেষে পর্দায় একটি কোড ভেসে ওঠে, যার মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত অনলাইন গ্যালারিতে প্রবেশ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই ছবি সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন করে। স্টুডিওর কেউই অতিথির ছবি দেখেন না বা সংরক্ষণ করেন না। এই গোপনীয়তার নিশ্চয়তা শুরু থেকেই ব্যবস্থার ভেতরে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ত্বকের রং ও গঠনকে পরিমিতভাবে পরিশীলিত করে, কিন্তু ছবির স্বাভাবিকতা নষ্ট করে না। ফলে ছবিতে থাকে বাস্তবতার ছাপ।

ভবিষ্যতের নতুন অভিজ্ঞতা
এই স্টুডিও নিজেকে প্রচলিত আলোকচিত্রীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে না। বরং তারা তৈরি করছে একেবারে নতুন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে অভিনয়ের চাপ নেই, আছে শুধু নিজে হওয়ার স্বাধীনতা। উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়িয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। দুবাইয়ের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি আর গোপনীয়তার মেলবন্ধনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কতটা বদলে যেতে পারে।
![]()

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















