উত্তর-পশ্চিম চীনের শানসি প্রদেশে অবস্থিত কিনলিং পর্বতমালার গভীরে থাকা আওতাই ট্রেইল নিয়ে পর্বতারোহীদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—একদিনে চার ঋতু, দশ মাইল হাঁটলে দশ রকমের আবহাওয়া। এই কথাটি মূলত এই পথের ভয়ংকর অনিশ্চিত আবহাওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে প্রকৃত আতঙ্কের কারণ শুধু প্রকৃতি নয়, বরং এই ট্রেইলের চরম ঝুঁকি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাঁচজন মানুষ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আওতাই ট্রেইল পার হওয়ার চেষ্টা করলে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাটি আবারও কিনলিং পর্বতমালার এই ভয়ংকর অংশকে জনআলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রায় ষোলশ কিলোমিটার বিস্তৃত কিনলিং পর্বতমালা উত্তর ও দক্ষিণ চীনের প্রাকৃতিক সীমানা। এই পর্বতমালার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আওতাই ট্রেইল, যা কিনলিংয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আওশানকে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তাইবাইশানের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
চীনের পর্বতারোহীদের কাছে আওতাই ট্রেইল পরিচিত সবচেয়ে ভীতিকর রুটগুলোর একটি হিসেবে। কিনলিং পর্বতমালার একেবারে কেন্দ্রভাগ কেটে এই পথটি প্রায় একশ সত্তর কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এতে রয়েছে সতেরটি শৃঙ্গ, যেগুলোর উচ্চতা তিন হাজার চারশ মিটারের বেশি। এর বড় অংশই জনমানবহীন এলাকা, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পর্যন্ত পৌঁছায় না।

চীনা পর্বতারোহণ সমিতির পেশাদার পর্বত ও আউটডোর গাইড সান ওয়েইগাং জানান, এই পথে একবার ঢুকে পড়লে ফিরে আসার বা পরিকল্পনা বদলানোর সুযোগ প্রায় নেই, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে জনবসতিহীন মূল শৈলশিরা ধরে চলতে হয়।
এই কারণেই দুই হাজার আঠারো সাল থেকে আওতাই ট্রেইলে চলাচল সরকারি ভাবে নিষিদ্ধ। তবু ‘চ্যালেঞ্জ নেওয়ার’ আকর্ষণ পুরোপুরি দমন করা যায়নি। ঝুঁকির কথা জানা সত্ত্বেও কিছু অভিযাত্রী এই পথে নামেন, আর বারবার ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা এর ভয়াবহতাই সামনে আনে।
নিষ্ঠুর পথ
চীনের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বতারোহণ পথ—এই পরিচয়টি এসেছে বছরের পর বছর ধরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও উদ্ধার অভিযানের ফল হিসেবে।
এই ঝুঁকির বড় কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। কিনলিং পর্বতমালা উত্তর ও দক্ষিণ চীনের জলবায়ুগত বিভাজনের কেন্দ্র। এখানে প্রায়ই ঠান্ডা ও উষ্ণ বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষ ঘটে, বিশেষ করে মূল শৈলশিরা বরাবর।
সান ওয়েইগাং বলেন, এখানকার আবহাওয়া পরিবর্তনের গতি মানুষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত। এক মুহূর্তে পরিষ্কার আকাশ, পরক্ষণেই কুয়াশা বা হঠাৎ তাপমাত্রা নেমে যাওয়া—সবই খুব দ্রুত ঘটে এবং আগাম অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।

তবে আবহাওয়া শুধু শুরু। অনেক পর্বতারোহী যে কারণে বিপদে পড়েন, তা হলো পায়ের নিচের ভূপ্রকৃতি। আওতাই ট্রেইলের বড় অংশই হিমবাহের কার্যকলাপে তৈরি পাথুরে মোরেইন এলাকা। এখানে হাঁটা মানে শুধু এগোনো নয়, বরং প্রতিটি পা ফেলার আগে বিচার-বিবেচনা, ভারসাম্য ঠিক করা এবং বারবার নিজেকে মানিয়ে নেওয়া।
এই মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে প্রকাশ পায় পথ হারানোর সময়। মোরেইন এলাকায় স্থায়ী কোনো ট্রেইল নেই। ঘন কুয়াশায় মানচিত্রে চিহ্নিত পথ আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য দ্রুত বাড়তে থাকে।
অনেকে মনে করেন মানচিত্রে পথ থাকলেই নিরাপদ, কিন্তু মানচিত্র বলে না আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক কোন দিকে হওয়া উচিত। মূল শৈলশিরা থেকে একটু সরে গেলেই গভীর গিরিখাত বা অজানা জঙ্গলে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, আর তখন নিখোঁজ হওয়া খুব সহজ।
অদৃশ্য বিপদ
আবহাওয়া, শারীরিক সক্ষমতা ও দিকনির্দেশ—এই তিনটি একসঙ্গে ব্যর্থ হলে আওতাই ট্রেইলের প্রকৃত ভয়ংকর রূপ প্রকাশ পায়। অতীতের দুর্ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, যারা বিপদে পড়েছেন তারা সবাই নবীন ছিলেন না।

চরম আউটডোর ক্রীড়াবিদ চেন শিয়োং, যিনি কিনলিং পর্বতমালায় একাধিক কঠিন রুট অতিক্রম করেছেন, বলেন আওতাই ট্রেইল এমন বিপজ্জনক যে অন্যান্য উচ্চভূমির পথে ভালো পারফরম্যান্স করা অভিযাত্রীরাও এখানে দ্রুত ভেঙে পড়তে পারেন।
তিনি একটি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন, যা আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি তখন আঠারো বছরের এক সঙ্গীর সঙ্গে আওতাই ট্রেইলে ছিলেন। বাইছিমিয়াওয়ের কাছে একটি শৈলশিরা পার হওয়ার সময় হঠাৎ তীব্র তুষারঝড়ে তারা পড়েন। পর্যাপ্ত ঠান্ডা-রোধক সুরক্ষা না থাকায় তার সঙ্গীর মাথা ও শরীরের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে নেমে যায়।
চেন বলেন, যদি তিনি তাকে পাহাড় থেকে নামিয়ে না আনতে পারতেন, কী হতে পারত তা কল্পনাও করতে চান না। এই অভিজ্ঞতা তাকে বুঝিয়েছে, সাহস এখানে ঝুঁকি কমায় না। আওতাই ট্রেইলের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
তবে প্রকৃতির চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে মানুষের ভুল মূল্যায়ন। যারা আওতাই ট্রেইল পাড়ি দিতে চান, তারা জানান সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোতে বেশির ভাগ সময় ভালো আবহাওয়ার দৃশ্যই দেখা যায়, যা এর কঠোর বাস্তবতাকে আড়াল করে।

চেন বলেন, অনেকেই উচ্চতায় নিজের শারীরিক সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেন। নির্ধারিত ক্যাম্পে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে দ্রুত পানিশূন্যতা ও অতিরিক্ত ঠান্ডার সম্মিলিত ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
এই সব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে একটি বড় শিক্ষা উঠে আসে। সান ওয়েইগাং মনে করিয়ে দেন, আউটডোর অভিযানের মূল কথা নিজের ক্ষমতা যাচাই নয়, বরং প্রকৃতিকে সম্পূর্ণভাবে বুঝে যুক্তিসঙ্গতভাবে অনুসন্ধান করা।
তিনি বলেন, পাহাড়কে ভালোবাসা মানে তাকে সম্মান করাও। নিজের ক্ষমতাকে কখনো অতিরিক্ত বড় করে দেখা যাবে না, আর প্রকৃতির শক্তিকেও কখনো ছোট করে দেখা যাবে না।
কিনলিং পর্বতমালার গভীরে সাহস নয়, বরং প্রকৃতির কঠোর নিয়মই চূড়ান্ত। এই নিষিদ্ধ শৈলশিরায় পা রাখার আগে সব অভিযাত্রীর মনে রাখা উচিত—পাহাড় বেপরোয়া আচরণ ক্ষমা করে না। কোনো ছবি, কোনো উত্তেজনা, কোনো মুহূর্তের গৌরবই এই ঝুঁকির যোগ্য নয়।
জিয়াং লি 


















