বিশ শতকের ফ্যাশন জগতের শেষ মহান কৌতুরিয়ে, যিনি রাজকীয় গ্ল্যামারকে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেই ভ্যালেন্তিনো গারাভানি আর নেই। ইতালির রোমে নিজ বাসভবনে সোমবার তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল তিরানব্বই বছর। তাঁর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে এই মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে। রোমের এক মেয়র একবার বলেছিলেন, ইতালিতে যেমন আছেন পোপ, তেমনই আছেন ভ্যালেন্তিনো। সেই বাক্যই যেন তাঁর জীবন ও প্রভাবের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
শেষ কৌতুরিয়ের বিদায়
ভ্যালেন্তিনো গারাভানি ছিলেন বিশ শতকের সেই বিরল ডিজাইনারদের একজন, যাঁরা রাজতন্ত্রের যুগ শেষ হয়ে গেলেও রাজকীয় পোশাকের স্বপ্নকে জীবিত রেখেছিলেন। মুকুটধারী রাজকন্যা থেকে শুরু করে ক্ষমতাচ্যুত সম্রাজ্ঞী, হলিউড তারকা থেকে সমাজের অভিজাত নারীরা তাঁর নকশায় নিজেদের রাজকীয় রূপ খুঁজে পেয়েছেন। দুই হাজার আট সালে তাঁকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রে তাঁকে বলা হয়েছিল শেষ সম্রাট, আর ফ্যাশন সাংবাদিক জন ফেয়ারচাইল্ড তাঁকে ডাকতেন শৈলীর শেখ নামে।
গ্ল্যামারের এক জীবন্ত প্রতীক
গাঢ় ট্যান করা ত্বক, নিখুঁতভাবে সাজানো চুল, চারপাশে সহযোগী আর পাগ কুকুরের দল নিয়ে ভ্যালেন্তিনো নিজেই ছিলেন এক চলমান ব্র্যান্ড। তাঁর নামেই তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ লাল রঙ, যা আজও ফ্যাশনের ইতিহাসে আলাদা করে চিহ্নিত। তিনি নিজেকে কখনও ট্রেন্ডের পেছনে ছোটেননি। সৌন্দর্যই ছিল তাঁর একমাত্র সাধনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমি শুধু সৌন্দর্য খুঁজি, সৌন্দর্য।
রাজনীতি ও পর্দার আইকনদের পোশাকশিল্পী
জ্যাকলিন কেনেডির বিয়ের সময়ের ক্রিম লেসের গাউন, ইরান ছাড়ার পথে ফারাহ দিবার পোশাক, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে বার্নাদেত শিরাকের পরা গাউন—সবই ছিল তাঁর সৃষ্টি। এলিজাবেথ টেলর, জুলিয়া রবার্টস, কেট ব্ল্যানচেটের মতো তারকারা তাঁর পোশাক পরে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। তাঁর দর্শন ছিল সহজ, নারীদের অসাধারণ করে তোলাই আমার কাজ।
ফ্যাশন শিল্পে ইতালির আসন নিশ্চিত
ব্যবসায়িক সঙ্গী জিয়ানকার্লো জিয়ামেত্তির সঙ্গে তিনি শুধু একটি ব্র্যান্ড গড়েননি, ইতালীয় ফ্যাশনকে প্যারিসের কৌতুর জগতের ভেতরের বৃত্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের হাত ধরেই পরে আরমানি, ভারসাচের মতো নাম উঠে আসে। লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ গড়েন এবং মিলান স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রথম ডিজাইনার ব্র্যান্ডে পরিণত হন।
শৈশব থেকে স্বপ্নের পথে
উনিশশো বত্রিশ সালে ইতালির ভোগেরা শহরে জন্ম ভ্যালেন্তিনোর। ছোটবেলা থেকেই রুচির পরিচয় স্পষ্ট ছিল। নিজের কাটলারি, নিজের রঙ বেছে নেওয়া পোশাক—সবই ছিল তাঁর শখ। হলিউডের এক সংগীতনাট্য দেখে ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন জন্ম নেয়। মিলান হয়ে প্যারিসে পড়াশোনা, তারপর রোমে ফিরে নিজের আতেলিয়ের সূচনা। সেখানেই শুরু হয় এক সাম্রাজ্যের।
ভ্যালেন্তিনোর জগৎ
গ্ল্যামার ছিল তাঁর জীবনের শ্বাসপ্রশ্বাস। লন্ডন, রোম, প্যারিস, নিউইয়র্ক, সুইজারল্যান্ডে তাঁর বাসভবন ছিল, যেখানে ঋতু আর সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি বসবাস করতেন। বিলাসী নৈশভোজ, শিল্পকর্ম, সামাজিক আড্ডা—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক জীবন যাপন করেছেন, যা আজকের কর্পোরেট ফ্যাশন জগতে প্রায় বিলুপ্ত।
অবসরের পরও সৃষ্টিশীলতা
রানওয়ে থেকে সরে গেলেও তিনি থেমে যাননি। বিশেষ বিয়ের গাউন তৈরি, অপেরার পোশাক পরিকল্পনা, রান্না ও টেবিল সাজানো নিয়ে বই প্রকাশ—সবখানেই ছিল তাঁর স্পর্শ। শেষ বয়সে তিনি জনসমক্ষে কম আসলেও তাঁর তৈরি ব্র্যান্ডের শোতে সামনের সারিতে বসে হাসিমুখে উপস্থিত থাকতেন।
সৌন্দর্যের উত্তরাধিকার
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমি চাই মানুষ আমাকে এমন একজন হিসেবে মনে রাখুক, যে যেখানে পারত সৌন্দর্যের খোঁজ করেছে। ভ্যালেন্তিনো গারাভানির জন্য সৌন্দর্য ছিল ক্ষমতার আরেক রূপ। সেই সৌন্দর্যের মুকুট পরে তিনি আজীবন রাজত্ব করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















