ব্রিটেনে ক্যানসার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হয়ে উঠেছে মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাকে জাতীয় ক্যান্সার পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনার জোরালো দাবি উঠেছে দাতব্য সংস্থা, রোগী অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে। এই দাবির নেতৃত্বে রয়েছেন ডেইলি এক্সপ্রেসের সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক, তিনি নিজেই দুরারোগ্য অন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত।
জাতীয় ক্যানসার পরিকল্পনার প্রাক্কালে উদ্বেগ
আগামী মাসে ব্রিটেনের জাতীয় ক্যানসার পরিকল্পনা প্রকাশের কথা রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এই পরিকল্পনা উন্মোচন করবেন, যিনি নিজেও অতীতে কিডনি ক্যান্সারের চিকিৎসা নিয়েছেন। নতুন পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়িয়ে চিকিৎসার ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।

রবার্ট ফিস্কের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা রবার্ট ফিস্ক জানিয়েছেন, তার এনএইচএস হাসপাতালে মানসিক সহায়তা কার্যত নেই বললেই চলে। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জানার পর মানসিকভাবে সামাল দেওয়ার মতো সহায়তা তিনি পাননি। তার অভিজ্ঞতাই ক্যান্সার কেয়ার ক্যাম্পেইনের সূচনা ঘটায়।

দাতব্য সংস্থাগুলোর যৌথ চিঠি
এই দাবির পক্ষে তিনজন ক্যান্সারজয়ী এবং সতেরোটি বড় ক্যানসার দাতব্য সংস্থার প্রধান একযোগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্যানসার চিকিৎসায় সামগ্রিক প্রয়োজন মূল্যায়ন যথাযথভাবে হচ্ছে না। রোগীর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক চাপ, ভয় ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মানসিক সহায়তার অভাব ও তার ভয়াবহ পরিণতি
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক রোগী ক্যান্সার মুক্ত ঘোষিত হওয়ার পরও ভয় ও মানসিক আতঙ্কে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কিছু হাসপাতালে সীমিত মানসিক সহায়তা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অনুপস্থিত। সব ক্যানসার ইউনিটে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক বলে মত দাতব্য সংস্থাগুলোর।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
স্টেম সেল প্রতিস্থাপন রোগীদের প্রায় অর্ধেক মানসিক সমস্যায় ভোগেন বলে জানিয়েছেন অ্যান্থনি নোলান দাতব্য সংস্থার প্রতিনিধি হেনি ব্রাউন। তার মতে, মাত্র অল্পসংখ্যক চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থায়ী মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। রাজনীতিক ও এনএইচএস নেতৃত্বকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রোগী ও স্বজনদের মানসিক চাপ
ব্রেস্ট ক্যান্সার নাউ সংস্থার প্রধান জানান, ক্যান্সার নির্ণয়ের পর রোগী ও তাদের পরিবার গভীর উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগেন। সেই সময়ে প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা না পেলে চিকিৎসার পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কম পরিচিত ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই মানসিক বোঝা আরও তীব্র বলে জানিয়েছে নিউরোএন্ডোক্রাইন ক্যানসার ইউকে।

সরকারের আশ্বাস ও প্রত্যাশা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্যান্সার কেয়ার ক্যাম্পেইনের চিঠি তারা পেয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। নতুন জাতীয় কৌশল ক্যান্সার থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে ব্রিটেনকে বিশ্বে শীর্ষ স্থানে নিয়ে যাবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে রোগী ও দাতব্য সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা, এই আশ্বাস যেন বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়।
মানসিক স্বাস্থ্যকে চিকিৎসার মূল অংশ করার দাবি
ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের প্রতিদিনের লড়াই শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। ভয়, অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বের সঙ্গে লড়তে গিয়ে অনেকেই ভেঙে পড়েন। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে ঐচ্ছিক নয়, ক্যানসার চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















