দ্য প্রিন্টকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ বা কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখাকে সরাসরি স্বৈরতন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের কোটি কোটি ভোটার কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন এবং এমন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু কিংবা বৈধ হতে পারে না।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। এই দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া মানে এমন লক্ষ লক্ষ নাগরিককে বাদ দেওয়া, যারা স্বাভাবিকভাবেই ভোট দিতে আগ্রহী হবেন না। তাঁর ভাষায়, “ভোটারদের অবশ্যই স্বাধীনভাবে তাদের পছন্দের দল বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। হুমকি, সহিংসতা কিংবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে ভোট আদায় করা হলে সেটিকে নির্বাচন বলা যায় না।”
নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আয়োজিত নির্বাচন কখনোই গণতান্ত্রিক হতে পারে না। তাঁর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার জানে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে বিপুল জনসমর্থন পাবে। সে কারণেই দলটিকে নিষিদ্ধ বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
ইউনূসকে সরাসরি আক্রমণ করে শেখ হাসিনা বলেন, “মুহাম্মদ ইউনূস নিজে কখনোই বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে একটি ভোটও পাননি। অথচ তিনি দেশের আইনগত কাঠামো নতুন করে লিখে নিজের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধ করার চেষ্টা করেছেন।” তিনি আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে কেউ গণতান্ত্রিক বৈধতার দাবি করতে পারে না। এটি সংস্কার নয়, বরং পরিবর্তনের মুখোশে স্বৈরতন্ত্র।
কার্যত নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ
মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নয়, কেবল রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত। কিন্তু শেখ হাসিনা এই ব্যাখ্যাকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর মতে, যখন একটি দল প্রচার চালাতে, সংগঠিত হতে কিংবা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না, তখন সেটি কার্যত নিষিদ্ধই।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা নিয়েই এখন অনিশ্চয়তায় দেশ।
৫ আগস্টের সহিংসতা ও দেশত্যাগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংসতার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে চলে যান। তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জাতির পিতা হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনার পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন দেখা দেয়।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়ে জুন থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন দমনের ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়।
ইউনূস প্রশাসনের অধীনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যে আইন প্রণয়ন করেছিল, সেটিই ২০২৫ সালে সংশোধন করে বর্তমান প্রশাসন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
২০২৪ সালের সহিংসতা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের পদক্ষেপ ছিল দেশের প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও প্রাণহানি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। তিনি জানান, ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া বৈধ আন্দোলনকে সরকার স্বাগত জানিয়েছিল এবং সরকারি চাকরির কোটা বাতিলসহ তাদের দাবিও মেনে নেওয়া হয়েছিল।
তবে তাঁর অভিযোগ, এক পর্যায়ে চরমপন্থীরা আন্দোলন দখল করে নেয়। এটি আর শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং সহিংস জনতার রূপ নেয়, যারা পুলিশ স্টেশনে হামলা চালায় ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করে। তিনি দাবি করেন, এই সহিংসতা ইউনূসের পরিকল্পনায় সংগঠিত হয়েছিল।
শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো, বিক্ষোভে নিহতদের মৃত্যুর তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিশন ইউনূস ক্ষমতায় এসেই বাতিল করেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে প্রকৃত সত্য আড়াল করতেই তদন্ত বন্ধ করা হয়েছিল এবং এর পেছনে বিদেশি জড়িত থাকার প্রশ্নও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
দেশে দ্রুত সাংবিধানিক শাসনে ফেরার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে পারে। তাঁর মতে, ভয় দেখিয়ে বা পক্ষপাতমূলক প্রয়োগের মাধ্যমে কখনো আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা যায় না।
ডিসেম্বরে ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মী শরীফ ওসমান হাদী নিহত হওয়ার পর টানা দুই দিনের সহিংসতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ওই সহিংসতায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনার ভাষায়, বর্তমান সহিংসতার মূল কারণ হলো একটি অনির্বাচিত সরকার, যার কোনো গণভিত্তি নেই। সংস্কারের নামে তারা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, জনতার বিচারের মাধ্যমে শাসন কায়েম করেছে এবং বৈধ রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর দমন করেছে।

সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ধর্মনিরপেক্ষতা
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু নাগরিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। এই ঘটনা ভারতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। দেশে হিন্দুদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় আট শতাংশ।
ইউনূস দাবি করেছেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা সাম্প্রদায়িক নয়, বরং রাজনৈতিক বা অপরাধমূলক। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ছয়শো পঁয়তাল্লিশটি ঘটনার মধ্যে মাত্র একাত্তরটিতে সাম্প্রদায়িক উপাদান ছিল।
তবে শেখ হাসিনার মতে, সংখ্যার হিসাব যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ১৯৭১ সালের সংবিধানে ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী পথ থেকে সরে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামি ও অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর পুনর্বাসন জাতির মূল কাঠামোর জন্য হুমকি। তাঁর ভাষায়, চরমপন্থীরা রাষ্ট্রকে সংযত করে না, বরং নিজেদের আদলে গড়ে তুলতে চায় এবং বহুত্ববাদের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়।
ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ
শেখ হাসিনা আরও বলেন, দেশে ইতিহাস বিকৃতির একটি সচেতন প্রক্রিয়া চলছে। ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ভাঙচুর ও ধ্বংস তারই উদাহরণ। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে ঝাপসা করে ভুক্তভোগী ও আগ্রাসীর পার্থক্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “যে জাতি তার স্বাধীনতার মূল্য ভুলে যায়, সে আবার তা অস্বীকারকারীদের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের সত্য সংরক্ষণ রাজনীতির বিষয় নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন।”
ইউনূস জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর দলটি আবার মূলধারার রাজনীতিতে ফিরেছে। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে জয় পেয়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শেখ হাসিনা।
সম্পাদনা: মাধুরিতা গোস্বামী
কেশব পদ্মনাভন 
























