মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশীদারিত্ব শুধু ইউক্রেন যুদ্ধেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত আক্রমণগুলোতে মস্কোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত ও অনিশ্চয়তা
গত এক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধ খুব কমই কোনো রাজধানীর নির্ধারিত সময়সূচি মেনে শেষ হয়।
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই এর বড় উদাহরণ। যুদ্ধের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল ইউক্রেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়বে। কিন্তু চার বছর পরও ইউক্রেন প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং জাপোরিঝঝিয়া ও দক্ষিণ ফ্রন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে দরিদ্র অঞ্চল থেকে আনা সৈন্য, উত্তর কোরিয়ার ইউনিট এবং জোরপূর্বক নিয়োগ করা আফ্রিকান যোদ্ধারাও অংশ নিয়েছে। তবু যুদ্ধটি রাশিয়ার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে তারা।

ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা
ইউক্রেনে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থেমে গেলে ক্রেমলিন সাহায্যের জন্য তেহরানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০২২ সালে ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ শুরু করে। পরে রাশিয়ার ইয়েলাবুগা শহরে এসব ড্রোন তৈরির একটি কারখানাও গড়ে তোলা হয়।
বর্তমানে সেই কারখানায় প্রতি মাসে হাজার হাজার ড্রোন তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ৫৩ হাজারেরও বেশি ড্রোন হামলা চালায়, যা ২০২৪ সালের প্রায় ১১ হাজার হামলার তুলনায় অনেক বেশি।
রাশিয়া-ইরান জোটের নতুন প্রভাব
এই অংশীদারিত্ব এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও প্রভাব ফেলছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে তখন রাশিয়া তাদের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।
অর্থাৎ রাশিয়া এই সংকটে কেবল পর্যবেক্ষক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানকে শক্তি জোগাচ্ছে।
মস্কোর আগের পদক্ষেপগুলোও একই ইঙ্গিত দেয়। ২০২০ সালে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে মার্কিন ও জোট বাহিনীর সৈন্য হত্যা করতে তালেবান যোদ্ধাদের পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরে পশ্চিমা জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদেরও স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহ করেছে মস্কো।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
ইরান যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই শাহেদ ড্রোন হামলায় কুয়েতে মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। দুবাইয়ে আমেরিকানদের ব্যবহৃত হোটেল, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সমর্থনের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এসব হামলার পরিকল্পনায় পুতিনের গোয়েন্দা সংস্থারও ভূমিকা থাকতে পারে।
ইউক্রেনে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা
সম্প্রতি ইউক্রেনের ওডেসা সফরের সময় মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সঙ্গে দেখা করেন একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা। তারা জানান, রাশিয়ার হামলায় তাদের প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশ ছাড়ার পরপরই আরও দুটি স্থাপনা আঘাতের মুখে পড়ে, যার মধ্যে একটি ছিল ওরিও বিস্কুট উৎপাদনকারী একটি মার্কিন কারখানা। বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা কাকতালীয় নয়; রাশিয়া সচেতনভাবেই মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করছে।
ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক

চার বছর ধরে রাশিয়ার ব্যবহৃত ইরানি ড্রোনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ইউক্রেন উন্নত প্রতিরোধ প্রযুক্তি তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সেই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন।
বর্তমানে ইউক্রেনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছেন, কীভাবে এই প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন হামলা মোকাবিলা করা যায়।
নীতিগত ভুল ও কৌশলগত দুর্বলতা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে শুরু থেকেই ইউক্রেনের এই অভিজ্ঞতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার নীতি এবং ইউক্রেনকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অনীহা একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে এখন মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রেই নতুন করে অনেক কিছু শিখতে হচ্ছে, যা ইউক্রেন বহু বছর ধরে বাস্তব যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে।
যুদ্ধ থেকে পুতিনের অর্থনৈতিক লাভ
বিস্তৃত যুদ্ধ পুতিনের জন্য আর্থিক সুবিধাও এনে দিতে পারে। গত এক দশকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এসেছে তেল ও গ্যাস থেকে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি দামের বৃদ্ধি ইতিমধ্যে ক্রেমলিনের আয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একই সঙ্গে এই যুদ্ধ পশ্চিমা সামরিক সম্পদকে বিভক্ত করে দিচ্ছে। ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার জন্য যে সামরিক সরঞ্জাম দরকার ছিল, তার অনেকটাই এখন অন্যত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি স্থল অভিযানে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়বে, যা ক্রেমলিনের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হামলা থামাতে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, তেমনি রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, পুতিনের যুদ্ধ তহবিল জোগানো ছায়া নৌবহরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র বিপরীত পথে এগোচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু রুশ তেল ভারতে রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে আরও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথাও আলোচনা হচ্ছে।
এতে অনেকের মতে এমন বার্তা যাচ্ছে যেন পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে আলোচনার পথই বেছে নেওয়া হচ্ছে।
স্পষ্ট অবস্থানের প্রয়োজন
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে মার্কিন নাগরিক বা স্বার্থে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট ও দৃঢ় প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।
পুতিন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো শক্তিগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের সহায়তা করছেন। এই বাস্তবতা স্বীকার করে তার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















