মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ধীরে ধীরে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে খাদ্যের দাম বেড়েছে এবং অনেক মানুষের জন্য খাদ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়েছে।
বেইরুতে আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্যের সংকট
৪৫ বছর বয়সী জয়নাব ইব্রাহিম জানান, তিনি ও তাঁর পরিবার ২ মার্চ বেইরুতের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে রমজানে রোজা শুরুর আগে সেহরির জন্য কোনো খাবার পাচ্ছেন না।
ইসরায়েলি হামলার কারণে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে। তাঁরা বসবাস করতেন বেইরুতের দক্ষিণাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ দাহিয়ায়, যা হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সেবা, গদি এবং বিশেষ করে খাবারের বড় ঘাটতি রয়েছে।

বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা ইফতারের খাবার সরবরাহ করলেও সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। জয়নাব ইব্রাহিম বলেন, একদিন তাঁদের জন্য মুরগি ও ভাত আনা হয়েছিল, কিন্তু তাতে আসলে মুরগি ছিল না—শুধু ভাতই ছিল।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ইতিমধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
যেসব পরিবার যুদ্ধের কারণে ঘরছাড়া হয়েছে বা আগে থেকেই খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সংগ্রাম করছিল—তাদের অবস্থাই সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। লেবানন, ইরান ও গাজায় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত আবার তীব্র হয়। এরপর থেকে লেবাননে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর
ইরানে চলমান যুদ্ধ দেশটির আগে থেকেই থাকা অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সমস্যাও তীব্র হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে ইরানের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তেহরানের বাসিন্দা আমির হোসেন বাঘেরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, শহরের অনেক বেকারি অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা হয়ে গেছে এবং খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিমের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
গাজায় মানবিক সংকট আরও তীব্র
ইরানের যুদ্ধের প্রভাব গাজাতেও পড়ছে, যেখানে মানবিক পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই ভয়াবহ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় গাজায় সাহায্যবাহী খাদ্য পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সেখানে খাদ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
পরে কিছু সীমান্তপথ খুলে দেওয়া হলেও বাজারে খাদ্যের দাম এখনো অনেক বেশি।
গাজা সিটির বাসিন্দা তিন সন্তানের বাবা হুসেইন গাবেন বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে দাম বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, গাজার যুদ্ধের সময়কার দুর্ভিক্ষ ও অভাবের স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। তাই যাদের টাকা ছিল তারা দ্রুত বাজারে গিয়ে যতটা সম্ভব খাদ্য কিনে মজুত করে।
তবে তাঁর কাছে কোনো নগদ অর্থ না থাকায় তিনি কিছুই কিনতে পারেননি।
তিনি জানান, তাঁর তাবুতে পাঁচ বস্তা ময়দা এবং কিছু টিনজাত মটরশুটি রয়েছে। এতে তাঁর পরিবারের প্রায় তিন মাস চলতে পারে।
তিনি বলেন, আশা করছি ইরানের যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই খাবারই আমাদের টিকিয়ে রাখবে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত
ইরানে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলও ধীর হয়ে গেছে, যা পুরো অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে।
এই বিঘ্নের ফলে জ্বালানি ও সার—উভয়ের দামই বাড়তে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সার হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কৃষি খাতে এই সংঘাতের পূর্ণ প্রভাব বুঝতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















