ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও গণউচ্ছেদ নির্দেশনার কারণে লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় সাত লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
লেবাননে নতুন মানবিক সংকট
মঙ্গলবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলা ও গণউচ্ছেদ নির্দেশনার ফলে লেবাননে প্রায় ৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ব্যাপক বোমা হামলার কারণে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধে নতুন একটি প্রধান সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
মানুষের এই ব্যাপক স্থানচ্যুতি নিয়ে লেবাননের সরকার ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ২০২৪ সালে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই দেশটি আবারও বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

সংঘাতের সূত্রপাত ও হামলার বিস্তার
গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ছোড়ে। এর পরপরই ইসরায়েল ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।
ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবানন এবং বৈরুতের কিছু অংশ খালি করার নির্দেশ দেয় এবং একই সঙ্গে বড় পরিসরে বোমা হামলা চালায়। লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবারও লেবাননের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। দক্ষিণ বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ দাহিয়া এলাকায়ও বোমা হামলা হয়। হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই এলাকাটি এক সপ্তাহ আগেও শত শত হাজার মানুষের বাসস্থান ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের অবিরাম বোমাবর্ষণে এখন এলাকাটি প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহর পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলের হামলার জবাবে হিজবুল্লাহও পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি স্থল অভিযান বিস্তৃত হওয়ায় সেখানে সংঘর্ষ চলছে। একই সঙ্গে তারা সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলের দিকে রকেট ও বিস্ফোরক ড্রোন ছুড়ছে।

সরকারের ওপর বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় লেবাননের নতুন সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধের পর গঠিত এই সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছিল যখন হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে অনেকটা কোণঠাসা ছিল।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সোমবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দেশটি সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
এই কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে লেবাননের আর্থিক সংকটে থাকা সেনাবাহিনীকে। তবে রাজনৈতিক ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখে এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, লেবানন সরকারের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নিজেদের বাস্তুচ্যুত হিসেবে নিবন্ধন করেছেন। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায়ই এক লাখের বেশি মানুষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
তবে কর্মকর্তারা মনে করছেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক পরিবার নিবন্ধন না করেই পালিয়ে গেছে।

অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবিক সংকট
দশ হাজারের বেশি মানুষ এখন স্কুল ও সরকারি ভবনে তৈরি করা জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। কিন্তু সীমিত সম্পদ ও জায়গার কারণে অনেকেই গাড়ির ভেতরে বা রাস্তার পাশে রাত কাটাচ্ছেন।
বৈরুতের সমুদ্রতীরবর্তী প্রমেনাড এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
সীমান্ত শহরেও খালি হচ্ছে বসতি
ইসরায়েল সীমান্তের কাছে অবস্থিত দক্ষিণ লেবাননের আলমা আল-শাব শহরের শেষ কয়েকজন বাসিন্দাও মঙ্গলবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের তত্ত্বাবধানে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
শহরটির মেয়র শাদি সায়াহ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা আমাদের ঘরেই থাকতে চাই।”
তিনি জানান, পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যে সেখানে থাকা সম্ভব হয়নি। সোমবার নিজের বাগানে কাজ করার সময় এক স্থানীয় বাসিন্দা ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।

বহুধর্মী সমাজে যুদ্ধের প্রভাব
লেবানন বহু ধর্ম ও জাতিগত সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি দেশ। দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত এবং হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থনভিত্তি হলেও সেখানে খ্রিস্টান, সুন্নি মুসলিম ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের ছোট ছোট জনপদও রয়েছে, যাদের অনেকেই হিজবুল্লাহকে সমর্থন করে না।
আলমা আল-শাবের হোটেল মালিক মিলাদ ঈদ প্রশ্ন তুলেছেন কেন বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হলো, যখন তারা সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন। তার দাবি, সেখানে কোনো সামরিক কার্যক্রম ছিল না এবং হিজবুল্লাহর উপস্থিতিও ছিল না।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত সপ্তাহে সতর্ক করে জানিয়েছে, লিতানি নদীর দক্ষিণে বসবাসকারী সবার জন্য ইসরায়েলের দেওয়া গণউচ্ছেদ নির্দেশনা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে ইসরায়েল বলছে, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















