মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ধীরে ধীরে এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় গড়াচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের ফল নির্ধারণ হবে কে কতদিন এই অবস্থায় লড়াই চালিয়ে যেতে পারে এবং কে আগে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায় তার ওপর।
এই যুদ্ধ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের উপকূলে এসে পৌঁছেছে।
শুক্রবার রাতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রতি লিটার তেলের দামে ৫৫ রুপি বাড়ানোর যে ঘোষণা দিয়েছে, তা হয়তো সামনে আরও বাড়তির শুরু মাত্র। শুধু দাম নয়, জ্বালানি আদৌ পর্যাপ্ত থাকবে কি না—এই প্রশ্নও এখন সামনে চলে এসেছে, যদিও বলা হয়েছিল দেশে ২৮ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে।
ডন পত্রিকার সঙ্গে কথা বলা তেল খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক তেলবাজার এখন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিশ্ববাজার থেকে কার্যত হারিয়ে গেছে। একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিঘ্ন বলা হচ্ছে। ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের সময়ও এত বড় পরিমাণ তেল হঠাৎ বাজার থেকে হারিয়ে যায়নি।
গোল্ডম্যান স্যাকসের শুক্রবারের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি মার্চজুড়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের প্রবাহ কম থাকে, তাহলে পরিশোধিত তেলের দাম ২০০৮ ও ২০২২ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
২০০৮ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। আর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দুই রেকর্ডই ভেঙে যেতে পারে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি তেলের দামের ধাক্কা সামলাতে খুব একটা সক্ষম নয়। ২০০৮ সালের পর দেশটির তেল খাতে অন্তত চারবার বড় সংকট তৈরি হয়েছে। কখনও সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে, আবার কখনও সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বাড়লেও ভোক্তাদের ওপর তা চাপাতে না গিয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।

পাকিস্তানের তেল সংকটের ইতিহাস
২০১৫ সালের তথাকথিত ‘পেট্রোল সংকট’-এর জন্য তখনকার সরকার দাবি করেছিল, তেলের দাম হঠাৎ কমে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক গাড়িচালক সিএনজি ছেড়ে পেট্রোলে চলে আসেন। এতে চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়।
২০২০ সালের জুনে আরেকটি জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় চাহিদা হঠাৎ কমে যায় এবং পরে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর দ্রুত বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়া এবং সরকারের আমদানি নিষেধাজ্ঞাও যুক্ত ছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে সরকার ভোক্তাদের চাপ কমাতে ভর্তুকি দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এতে ভর্তুকির বিল দ্রুত বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি আবারও বিলম্বিত হয়। সেই সময় দেশ কার্যত ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়ে।
এই ঘটনাগুলো থেকে দুটি শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, তেলের দাম বাড়া-কমার ধাক্কা যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সরকার দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়—মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
২০০৭-০৮ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও তৎকালীন সরকার তা ভোক্তাদের ওপর চাপায়নি। ফলে তেল খাতে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের সার্কুলার ঋণ তৈরি হয়। পরে সরকার টাকা ছাপিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করে, যার ফল ছিল তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন।
২০২২ সালেও প্রায় একই ঘটনা ঘটে। ভর্তুকির বিল তিন মাসেই এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে দাম হঠাৎ বাড়াতে হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং রুপির বড় অবমূল্যায়ন ঘটে।
২০১৫ সালের সংকটে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় পাঞ্জাবজুড়ে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়েছিল এবং কৃষিপণ্য শহরে পৌঁছাতে না পেরে মাঠেই নষ্ট হয়।
২০২০ সালের কোভিড সময়েও একইভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সরকার আমদানি বন্ধ করে স্থানীয় রিফাইনারি থেকে তেল কিনতে বাধ্য করেছিল। পরে দাম হঠাৎ কমানো ও বাড়ানোর ফলে পাম্পগুলোতে তেল সংকট তৈরি হয়।

৫৫ রুপি দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত
যদি সঠিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না যায়, জ্বালানি বাজারের ধাক্কা হয় সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দেয়, নয়তো মুদ্রাস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এবার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা মধ্যবর্তী সময়েই প্রতি লিটার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ৫৫ রুপি বাড়িয়ে দিয়েছে।
এর একটি উদ্দেশ্য ছিল মজুতদারি ঠেকানো। যদি সরকার ১৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করত, তাহলে অনেক বিক্রেতা দাম বাড়ার আগ পর্যন্ত তেল বিক্রি না করে মজুত করে রাখতে পারত।
তবে এই সিদ্ধান্তের পরই সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ মানুষের ওপর এমন চাপ দেওয়া হলেও সরকার আবার ভিআইপিদের জন্য বিলাসবহুল বিমান কিনছে এবং কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল সুবিধা দিচ্ছে।
সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইলও বলেন, তেল কোম্পানিগুলো এই সিদ্ধান্তে বড় মুনাফা পাবে, কারণ তারা ফেব্রুয়ারিতে কেনা তেল এখন মার্চের বাড়তি দামে বিক্রি করবে।
তবে তেল খাতের কর্মকর্তারা এ অভিযোগ মানতে রাজি নন। তাদের যুক্তি, আইনের কারণে তাদের সব সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল মজুত রাখতে হয়। তাই পুরোনো তেল বিক্রি করলেও নতুন তেল কিনতে হয় বেশি দামে।

যুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব
শুক্রবার যখন দাম বাড়ানো হয়, তখন ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার। সপ্তাহের শুরুতে এটি ছিল ৭৭ ডলার।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। ইরান নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের তেল সংরক্ষণাগারে হামলা করে।
এর পাশাপাশি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।
সোমবার তেলের বাজার খুলতেই ব্রেন্টের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এশিয়ার শেয়ারবাজার পড়ে যায় এবং পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়।
এখন যুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক ধাক্কা সামনে আসতে শুরু করেছে। শুক্রবারের দাম বৃদ্ধি সম্ভবত সামনে আরও বৃদ্ধির শুরু মাত্র।
তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে। খাদ্যদ্রব্য, পরিবহন ভাড়া এবং বিদ্যুতের দাম সবই বাড়বে।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো প্রবাসী আয়। পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। যুদ্ধ তীব্র হলে এই আয়ও কমে যেতে পারে।
পাশাপাশি পাকিস্তানের পশ্চিমমুখী রপ্তানির বেশিরভাগই উপসাগরীয় বন্দর দিয়ে যায়। এসব বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হলে রপ্তানিও কমে যাবে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পেট্রোলের দাম পাকিস্তানে ৪০০ রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ডলার ৩০০ রুপির ওপরে উঠে যেতে পারে।

ডিজেল নিয়ে নতুন উদ্বেগ
তেল খাতের কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ডিজেল সরবরাহ।
পাকিস্তানের ডিজেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালীর ভেতরের দেশগুলো থেকে আসে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সরবরাহ চুক্তি রয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বুকিং তিন মাস পরের জন্য।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে গম কাটার মৌসুম। এই সময় ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
যদি তখন ডিজেলের সংকট হয়, তাহলে গমের দাম বেড়ে যাবে এবং খাদ্যদ্রব্যের মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে।

যুদ্ধের অচলাবস্থা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী পাঠায়, তাহলে তা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতির নৌকার আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করবে।
১৯৮০-এর দশকের ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’-এর সময়ও এমন ঘটনা ঘটেছিল, যখন ইরান ও ইরাক একে অপরের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করেছিল।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতাও তত বাড়বে।
মার্চ মাসে পাকিস্তানের তেলের মজুত তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। তবে যুদ্ধ যদি আরও কয়েক সপ্তাহ চলে, তাহলে যে অস্থিরতা তৈরি হবে তার মাত্রা অনুমান করা কঠিন।
খুররম হুসাইন 



















