১০:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক ইরান যুদ্ধে বেসামরিক ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ পোপ লিওর তেলের বাজারে অস্থিরতা: ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সুপারিশ আইইএর

ট্রাম্প কীভাবে আমেরিকানদের প্রতি তাঁর প্রথম দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেন

গত মাসে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমেরিকান সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো আমেরিকান নাগরিকদের রক্ষা করা।” বক্তব্যের সময় তিনি ডেমোক্র্যাটদের দাঁড়িয়ে সম্মতি জানাতে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। রাজনৈতিক নাটক হিসেবে এটি হয়তো কার্যকর ছিল। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর বাস্তবতায় — অর্থাৎ আমেরিকান নাগরিকদের প্রকৃত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে — ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্পের অবহেলামূলক দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা লক্ষাধিক আমেরিকানের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলছে।

প্রস্তুতির ঘাটতি ও প্রশাসনের বিভ্রান্তি

মার্কিন সরকারের প্রস্তুতির অভাব বিস্ময়কর। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা চলছিল। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত ছিল দূতাবাসগুলোকে আগাম সতর্ক করা এবং কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া।

নাগরিকদের কাছে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরিষ্কার ও সময়োপযোগী বার্তা পৌঁছানো দরকার ছিল, পাশাপাশি কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে সে নির্দেশনাও দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি। অনেক বেসামরিক আমেরিকানকে নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। এমনকি যখন মার্কিন কর্মকর্তারা সামাজিক মাধ্যমে “এখনই চলে যান” বলে সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন, তখনও অঞ্চলের মাত্র দুটি মার্কিন দূতাবাস স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল।

US, UK and France ask their citizens to leave Lebanon as war fears loom

যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র একদিন আগে পররাষ্ট্র দপ্তর কেবল ইসরায়েল ও লেবাননে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়। অধিকাংশ দেশে বাধ্যতামূলকভাবে চলে যাওয়ার নির্দেশ আসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল পূর্বানুমেয়

ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চালানো সামরিক অভিযানের জবাবে তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব ছিল। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বিশেষ করে বিমানবন্দর ও হোটেলের মতো তুলনামূলক দুর্বল স্থাপনাগুলোকে। সংঘাতকে বিস্তৃত করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোই ছিল তাদের লক্ষ্য।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কূটনীতিক বা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যথাযথ সতর্কবার্তাও দেয়নি। যখন অবশেষে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ আসে, তখনও কীভাবে বা আদৌ সরকার সহায়তা করবে কিনা সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না।

আঞ্চলিক সমন্বয়ের ঘাটতি

অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ও ছিল খুবই সীমিত, যাতে তারা নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে পারে। বিদেশে থাকা আমেরিকানদের যেমন সতর্ক করা হয়নি, তেমনি মিত্র দেশগুলোকেও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।

Iran War: Attacks Intensify in UAE, Iraq, Tehran With Shipping, Energy  Targeted - Bloomberg

এদিকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপ্তি অনুমান করতে পারেনি। ইরানের হামলায় পুরো অঞ্চলের বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

২০০৬ সালের অভিজ্ঞতা

এই পরিস্থিতি এভাবে ঘটতেই হতো এমন নয়। আমরা দুজনই বিদেশে সংকটের সময় আমেরিকানদের সুরক্ষার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর উসকানিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। তখন লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং পেন্টাগনের লেভান্ট অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অযুদ্ধকালীন নাগরিক সরিয়ে নেওয়ার অভিযান পরিচালনা করি।

সেই সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। হঠাৎ করেই বৈরুতের মার্কিন দূতাবাস যুদ্ধের প্রথম সারিতে চলে আসে। ইসরায়েল বিমানবন্দরের রানওয়ে ধ্বংস করে, সমুদ্রবন্দর অবরুদ্ধ করে এবং সিরিয়ার সীমান্ত পারাপারের পথগুলো ধ্বংস করে দেয়। সন্দেহভাজন যানবাহনের ওপর বিমান হামলাও চলছিল। ফলে লেবানন থেকে বাণিজ্যিক পথে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

দূতাবাসের ভেতরে একটি হেলিকপ্টার অবতরণস্থল ছাড়া লেবাননে আমাদের কাছে তেমন কোনো সামরিক সম্পদ ছিল না, অথচ দূতাবাসের বাইরে হাজারো আমেরিকান সাহায্যের অপেক্ষায় ছিলেন।

Iran strikes day 3: Pentagon chief Hegseth hails 'most precise aerial  operation in history' | South China Morning Post

তবুও সেই সময় হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র দপ্তর, পেন্টাগন এবং তিনটি সামরিক কমান্ডের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করেছেন। জর্ডানে মহড়ায় থাকা মার্কিন মেরিন সদস্যদের ডেকে পাঠানো হয়। ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলায় যে ইউনিট বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল, সেই ব্যাটালিয়নের সদস্যরাই আবার লেবাননে ফিরে এসে নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধার কাজে অংশ নেন।

কনস্যুলার কর্মকর্তারা নাগরিকত্বের নথি যাচাই করেন, ফোন সহায়তা কেন্দ্র চালু করেন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা সমন্বয় করে যাতে ইসরায়েলি হামলা আমাদের উদ্ধার পথের সঙ্গে সংঘর্ষে না পড়ে।

এই প্রচেষ্টার ফলে এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় ১৫ হাজার আমেরিকান নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা

এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তৎপরতার তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট। বৈরুতের মার্কিন দূতাবাসসহ অঞ্চলের কয়েকটি দূতাবাস কার্যত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কনস্যুলার কার্যক্রম স্থগিত করেছে, যখন এই সেবার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

সহিংসতা বাড়ার পর এবং যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে ট্রাম্প প্রশাসন ১৪টি দেশ থেকে আমেরিকান নাগরিকদের নিজ দায়িত্বে চলে যেতে আহ্বান জানায়। কিন্তু আকাশপথ বন্ধ থাকায় বাণিজ্যিক যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ইরানের ক্ষমতায় আসার মতো সম্ভাব্য সব উত্তরসূরি নিহত হয়েছেন: ট্রাম্প | The  Business Standard

অনেক দূতাবাসেই স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই, ফলে স্বাগতিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দিষ্ট নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের শূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যুদ্ধের চতুর্থ দিনে এসে পররাষ্ট্র দপ্তর স্বীকার করে যে সরকারকে হয়তো নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে সহায়তা করতে হতে পারে।

পরিকল্পনার অভাব

এই পরিস্থিতির অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল। প্রশাসন যদি বলে যে তারা ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা অনুমান করতে পারেনি, তবে তা ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতার পরিচয় দেয়। ২০০৬ সালে লেবাননে আমাদের কাছে আগাম সতর্কবার্তা ছিল না। কিন্তু এবার ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির জন্য।

তারা চাইলে আগেভাগেই বাণিজ্যিক জাহাজ ও পরিবহন ব্যবস্থার চুক্তি করে নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারত।

নিশ্চয়ই বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৬ সালের চেয়ে অনেক জটিল। তখন প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, আর এখন সম্ভাব্য সংখ্যা কয়েক লাখ। তখন একটি দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এখন ১৪টি দেশ জড়িত। তাছাড়া ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করাও কঠিন।

কিন্তু এই জটিলতাই পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

How the Iranian Regime Survived: Examining Internal and External  Strategies, Articles Mahjoob Zweiri, Yara Nassar | Insight Turkey

যুদ্ধের ঝুঁকি ও নাগরিক নিরাপত্তা

ইরানের শাসনব্যবস্থা যতই দমনমূলক হোক — নিজেদের জনগণের ওপর কঠোর দমননীতি, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল ভূমিকা এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা — তবুও তারা আমেরিকান জনগণের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।

কিন্তু ট্রাম্পের শুরু করা এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকান বেসামরিক নাগরিকদের জন্য তাৎক্ষণিক ও গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন যখন যুদ্ধের পরিকল্পনা করছিল, তখনই তাদের উচিত ছিল আমেরিকানদের সুরক্ষার পরিকল্পনাও করা — সেই দায়িত্বই তো প্রেসিডেন্ট নিজে বলেছেন আমেরিকান সরকারের “প্রথম দায়িত্ব”।

জেফ্রি ফেল্টম্যান ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং পরে নিকটপ্রাচ্য বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মারা কার্লিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কৌশল, পরিকল্পনা ও সক্ষমতা বিষয়ক সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং ২০০৬–২০০৭ সালে পেন্টাগনে লেভান্ট অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তারা দুজনই ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।

জনপ্রিয় সংবাদ

পিরিয়ড ট্যাক্সের বিরুদ্ধে তরুণ আইনজীবী মাহনূর ওমরের লড়াই, পাকিস্তানে শুরু নতুন জাতীয় বিতর্ক

ট্রাম্প কীভাবে আমেরিকানদের প্রতি তাঁর প্রথম দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেন

০৩:৩০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

গত মাসে স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমেরিকান সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো আমেরিকান নাগরিকদের রক্ষা করা।” বক্তব্যের সময় তিনি ডেমোক্র্যাটদের দাঁড়িয়ে সম্মতি জানাতে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। রাজনৈতিক নাটক হিসেবে এটি হয়তো কার্যকর ছিল। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর বাস্তবতায় — অর্থাৎ আমেরিকান নাগরিকদের প্রকৃত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে — ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ট্রাম্পের অবহেলামূলক দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা লক্ষাধিক আমেরিকানের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলছে।

প্রস্তুতির ঘাটতি ও প্রশাসনের বিভ্রান্তি

মার্কিন সরকারের প্রস্তুতির অভাব বিস্ময়কর। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা চলছিল। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত ছিল দূতাবাসগুলোকে আগাম সতর্ক করা এবং কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া।

নাগরিকদের কাছে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে পরিষ্কার ও সময়োপযোগী বার্তা পৌঁছানো দরকার ছিল, পাশাপাশি কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে সে নির্দেশনাও দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি। অনেক বেসামরিক আমেরিকানকে নিজেদের মতো করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। এমনকি যখন মার্কিন কর্মকর্তারা সামাজিক মাধ্যমে “এখনই চলে যান” বলে সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন, তখনও অঞ্চলের মাত্র দুটি মার্কিন দূতাবাস স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল।

US, UK and France ask their citizens to leave Lebanon as war fears loom

যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র একদিন আগে পররাষ্ট্র দপ্তর কেবল ইসরায়েল ও লেবাননে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়। অধিকাংশ দেশে বাধ্যতামূলকভাবে চলে যাওয়ার নির্দেশ আসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল পূর্বানুমেয়

ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চালানো সামরিক অভিযানের জবাবে তারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব ছিল। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বিশেষ করে বিমানবন্দর ও হোটেলের মতো তুলনামূলক দুর্বল স্থাপনাগুলোকে। সংঘাতকে বিস্তৃত করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোই ছিল তাদের লক্ষ্য।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কূটনীতিক বা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং যথাযথ সতর্কবার্তাও দেয়নি। যখন অবশেষে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ আসে, তখনও কীভাবে বা আদৌ সরকার সহায়তা করবে কিনা সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না।

আঞ্চলিক সমন্বয়ের ঘাটতি

অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ও ছিল খুবই সীমিত, যাতে তারা নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে পারে। বিদেশে থাকা আমেরিকানদের যেমন সতর্ক করা হয়নি, তেমনি মিত্র দেশগুলোকেও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি।

Iran War: Attacks Intensify in UAE, Iraq, Tehran With Shipping, Energy  Targeted - Bloomberg

এদিকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপ্তি অনুমান করতে পারেনি। ইরানের হামলায় পুরো অঞ্চলের বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

২০০৬ সালের অভিজ্ঞতা

এই পরিস্থিতি এভাবে ঘটতেই হতো এমন নয়। আমরা দুজনই বিদেশে সংকটের সময় আমেরিকানদের সুরক্ষার কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলাম। ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর উসকানিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। তখন লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং পেন্টাগনের লেভান্ট অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অযুদ্ধকালীন নাগরিক সরিয়ে নেওয়ার অভিযান পরিচালনা করি।

সেই সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। হঠাৎ করেই বৈরুতের মার্কিন দূতাবাস যুদ্ধের প্রথম সারিতে চলে আসে। ইসরায়েল বিমানবন্দরের রানওয়ে ধ্বংস করে, সমুদ্রবন্দর অবরুদ্ধ করে এবং সিরিয়ার সীমান্ত পারাপারের পথগুলো ধ্বংস করে দেয়। সন্দেহভাজন যানবাহনের ওপর বিমান হামলাও চলছিল। ফলে লেবানন থেকে বাণিজ্যিক পথে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

দূতাবাসের ভেতরে একটি হেলিকপ্টার অবতরণস্থল ছাড়া লেবাননে আমাদের কাছে তেমন কোনো সামরিক সম্পদ ছিল না, অথচ দূতাবাসের বাইরে হাজারো আমেরিকান সাহায্যের অপেক্ষায় ছিলেন।

Iran strikes day 3: Pentagon chief Hegseth hails 'most precise aerial  operation in history' | South China Morning Post

তবুও সেই সময় হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র দপ্তর, পেন্টাগন এবং তিনটি সামরিক কমান্ডের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করেছেন। জর্ডানে মহড়ায় থাকা মার্কিন মেরিন সদস্যদের ডেকে পাঠানো হয়। ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলায় যে ইউনিট বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল, সেই ব্যাটালিয়নের সদস্যরাই আবার লেবাননে ফিরে এসে নিজেদের নাগরিকদের উদ্ধার কাজে অংশ নেন।

কনস্যুলার কর্মকর্তারা নাগরিকত্বের নথি যাচাই করেন, ফোন সহায়তা কেন্দ্র চালু করেন এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা সমন্বয় করে যাতে ইসরায়েলি হামলা আমাদের উদ্ধার পথের সঙ্গে সংঘর্ষে না পড়ে।

এই প্রচেষ্টার ফলে এক মাসেরও কম সময়ে প্রায় ১৫ হাজার আমেরিকান নাগরিককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা

এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তৎপরতার তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট। বৈরুতের মার্কিন দূতাবাসসহ অঞ্চলের কয়েকটি দূতাবাস কার্যত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে এবং কনস্যুলার কার্যক্রম স্থগিত করেছে, যখন এই সেবার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

সহিংসতা বাড়ার পর এবং যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে ট্রাম্প প্রশাসন ১৪টি দেশ থেকে আমেরিকান নাগরিকদের নিজ দায়িত্বে চলে যেতে আহ্বান জানায়। কিন্তু আকাশপথ বন্ধ থাকায় বাণিজ্যিক যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ইরানের ক্ষমতায় আসার মতো সম্ভাব্য সব উত্তরসূরি নিহত হয়েছেন: ট্রাম্প | The  Business Standard

অনেক দূতাবাসেই স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই, ফলে স্বাগতিক দেশের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দিষ্ট নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর ও সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের শূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যুদ্ধের চতুর্থ দিনে এসে পররাষ্ট্র দপ্তর স্বীকার করে যে সরকারকে হয়তো নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে সহায়তা করতে হতে পারে।

পরিকল্পনার অভাব

এই পরিস্থিতির অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল। প্রশাসন যদি বলে যে তারা ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা অনুমান করতে পারেনি, তবে তা ইচ্ছাকৃত অজ্ঞতার পরিচয় দেয়। ২০০৬ সালে লেবাননে আমাদের কাছে আগাম সতর্কবার্তা ছিল না। কিন্তু এবার ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির জন্য।

তারা চাইলে আগেভাগেই বাণিজ্যিক জাহাজ ও পরিবহন ব্যবস্থার চুক্তি করে নাগরিকদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারত।

নিশ্চয়ই বর্তমান পরিস্থিতি ২০০৬ সালের চেয়ে অনেক জটিল। তখন প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, আর এখন সম্ভাব্য সংখ্যা কয়েক লাখ। তখন একটি দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এখন ১৪টি দেশ জড়িত। তাছাড়া ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করাও কঠিন।

কিন্তু এই জটিলতাই পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

How the Iranian Regime Survived: Examining Internal and External  Strategies, Articles Mahjoob Zweiri, Yara Nassar | Insight Turkey

যুদ্ধের ঝুঁকি ও নাগরিক নিরাপত্তা

ইরানের শাসনব্যবস্থা যতই দমনমূলক হোক — নিজেদের জনগণের ওপর কঠোর দমননীতি, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল ভূমিকা এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা — তবুও তারা আমেরিকান জনগণের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।

কিন্তু ট্রাম্পের শুরু করা এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকান বেসামরিক নাগরিকদের জন্য তাৎক্ষণিক ও গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন যখন যুদ্ধের পরিকল্পনা করছিল, তখনই তাদের উচিত ছিল আমেরিকানদের সুরক্ষার পরিকল্পনাও করা — সেই দায়িত্বই তো প্রেসিডেন্ট নিজে বলেছেন আমেরিকান সরকারের “প্রথম দায়িত্ব”।

জেফ্রি ফেল্টম্যান ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন এবং পরে নিকটপ্রাচ্য বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মারা কার্লিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কৌশল, পরিকল্পনা ও সক্ষমতা বিষয়ক সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং ২০০৬–২০০৭ সালে পেন্টাগনে লেভান্ট অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তারা দুজনই ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।