ভারতের বৃহত্তম বিমানসংস্থা ইন্ডিগোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার এলবার্স হঠাৎ করেই পদত্যাগ করেছেন। পাইলট সংকটের কারণে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল, যাত্রী ভোগান্তি এবং কোম্পানির মুনাফায় বড় ধাক্কার কয়েক মাস পরই এই সিদ্ধান্ত এল।
পদত্যাগের ঘোষণা
মঙ্গলবার তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা নিয়ে ইন্ডিগোর প্রধান নির্বাহী পদ থেকে সরে দাঁড়ান পিটার এলবার্স। স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়া এক ঘোষণায় কোম্পানি জানায়, নতুন প্রধান নির্বাহী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাহুল ভাটিয়া সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
রাহুল ভাটিয়া এক বিবৃতিতে বলেন, দেশের প্রতি এবং যাত্রী, কর্মী, শেয়ারহোল্ডার ও অন্যান্য অংশীজনের প্রতি তার গভীর দায়বদ্ধতা রয়েছে। তিনি জানান, ইন্ডিগো ভবিষ্যতেও সেবার মান, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং অংশীজনদের আস্থা বজায় রেখে পরিচালিত হবে। পাশাপাশি একটি পেশাদারভাবে পরিচালিত, নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত বিমানসংস্থা হিসেবে ভারতের মানুষের সেবা দেওয়ার কৌশল আরও শক্ত করা হবে।

সংকটের শুরু: পাইলট সংকট ও ফ্লাইট বাতিল
এলবার্সের পদত্যাগের আগে ইন্ডিগো দীর্ঘ এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে নতুন বিশ্রাম নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর কোম্পানির কার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল পাইলটদের অতিরিক্ত ক্লান্তি কমানো। নতুন বিধি অনুযায়ী মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময়কে রাতের ডিউটি হিসেবে ধরা হয়, যা আগে ভোর ৫টা পর্যন্ত ছিল। একই সঙ্গে পরপর রাতের শিফটে কাজ করার সীমাও দুইটিতে বেঁধে দেওয়া হয়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত পাইলট মোতায়েন করতে না পারায় ইন্ডিগো বিপাকে পড়ে। ফলস্বরূপ অন্তত ৪,৫০০টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয় এবং হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়েন।
ভাবমূর্তি ও মুনাফায় বড় আঘাত
এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের কর্মপরিবেশ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে ইন্ডিগোর ভাবমূর্তিতেও বড় ধাক্কা লাগে।

আর্থিক দিক থেকেও এর প্রভাব পড়ে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে কোম্পানির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ কমে ৫৫০ কোটি রুপিতে নেমে আসে। এই সংকটের কারণে এককালীন প্রায় ৫৭৭ কোটি রুপির ক্ষতি বহন করতে হয়েছে ইন্ডিগোকে। এর মধ্যে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরোপিত ২২ কোটি ২০ লাখ রুপির জরিমানাও অন্তর্ভুক্ত।
সংকটের পর এক আয়-সংক্রান্ত আলোচনায় এলবার্স স্বীকার করেছিলেন, এই ঘটনা ইন্ডিগোর নিজস্ব মানদণ্ড এবং যাত্রীদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ছিল।
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
ডাচ বিমানসংস্থা কেএলএম-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে প্রায় আট বছর কাজ করার পর এলবার্স ইন্ডিগোতে যোগ দেন। তিনি আন্তর্জাতিক বাজারে সংস্থার উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন, যা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী—বিশেষ করে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানসংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করে তোলে।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভারতে ইন্ডিগো একটি শক্তিশালী ও সম্মানিত ব্র্যান্ড হলেও দেশের বাইরে এটি এখনও তেমন পরিচিত নয়।

বর্তমানে ইন্ডিগোর আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা প্রায় ৮০। ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে সংস্থার ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
বড় বিমান কেনার সিদ্ধান্ত
এলবার্স দায়িত্ব নেওয়ার পর ইন্ডিগো ২০২৩ সালে এয়ারবাস থেকে ৫০০টি সরু দেহের বিমান কেনার বিশাল অর্ডার দেয়। পরের বছর আরও ৩০টি প্রশস্ত দেহের বিমান কেনার চুক্তি করা হয়, যেখানে ভবিষ্যতে আরও ৭০টি বিমান কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইট সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পদত্যাগের কারণ
পদত্যাগপত্রে এলবার্স জানান, ব্যক্তিগত কারণেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং নোটিশ সময় মওকুফ করার অনুরোধ করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে কোম্পানির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর বা পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে তিনি প্রস্তুত আছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















